মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
নিজে গেলে ভুল দালাল ধরলেই সঠিক মৌলভীবাজার পাসপোর্ট অফিসে কিসের সিন্ডিকেট?
পাসপোর্ট অফিসে আবেদন জমা দিতে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা। অন্যদিকে অফিসের গেটের বাইরেই ফাইল হাতে ওৎ পেতে রয়েছে দালাল চক্রের সদস্যরা। সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, নিজেরা সরাসরি আবেদন করতে গেলে সামান্য কোনো ভুল বা ক্রুটির দোহাই দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অথচ দালালের শরণাপন্ন হয়ে বাড়তি টাকা দিলেই মুহূর্তে মিলে যাচ্ছে সমাধান। মৌলভীবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের দরুন চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। মৌলভীবাজার আঞ্চলি
ক পাসপোর্ট অফিসে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেবাগ্রহীতারা নির্ধারিত নিয়মে লাইনে দাঁড়িয়ে আবেদন জমা দিচ্ছেন। তবে আবেদনে কোনো তথ্যগত সামান্য ভুল থাকলে বা সংশোধন প্রয়োজন হলে সরাসরি ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে অফিসের গেটের বাইরে আবেদনকারীদের হাতে ফাইল ধরিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায় বেশ কয়েকজন দালালকে। এদের অনেকেই নিজেদের স্থানীয় কোনো ট্রাভেল এজেন্সির লোক বলে পরিচয় দেন। অভিযোগ রয়েছে, মৌলভীবাজার শহরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নাম-বেনামে অসংখ্য লাইসেন্সবিহীন ট্রাভেল এজেন্সি গড়ে উঠেছে, যাদের আড়ালে মূলত দালাল চক্রের সদস্যরা তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। পাসপোর্ট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ৫ বছর মেয়াদি ৪৮ পৃষ্ঠার ই-পাসপোর্টের জন্য নির্ধারিত সাধারণ ফি ৪,০২৫ টাকা, জরুরি ফি ৬,৩২৫ টাকা এবং অতি জরুরি ফি ৮,৬২৫ টাকা। তবে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরাসরি আবেদন জমা না নিয়ে সাধারণ আবেদনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি-র বাইরে অতিরিক্ত ১,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এছাড়া নাম, ভুল ঠিকানা সংশোধন বা অন্য কোনো জটিলতা থাকলে খরচের পরিমাণ ৩০,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকা পর্যন্ত চুক্তিতে গিয়ে ঠেকছে। এক প্রবাসী সেবাগ্রহীতার অভিযোগ: যারা দালালের মাধ্যমে আসছেন তারা সহজেই সেবা পাচ্ছেন। আর যারা নিজে নিজে চেষ্টা করছেন, তাদের আটকে দেওয়া হয়। পরে বাধ্য হয়েই দালালের কাছে যেতে হচ্ছে। ভুক্তভোগী অলি আহমেদ জানান, "আমি নিজে নিজে আবেদন করে দু’দিন পাসপোর্ট অফিসে গিয়েও আবেদন জমা দিতে পারিনি। সামান্য ভুল দেখিয়ে বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত ১,৫০০ টাকা বেশি দিয়ে জমা দিতে গেলে সাথে সাথে তা গ্রহণ করা হয়। প্রবাস ফেরত লিটন আহমেদ বলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশন তুলে নেওয়ায় মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেলেও অফিসের ভেতরের হয়রানি কমেনি। তবে যারা দালালের মাধ্যমে আসেন তারা ঠিকই সহজেই কাজ শেষ করতে পারছেন।অপর এক সেবাগ্রহীতা সায়মন আহমেদ জানান, এনআইডির মূল কপি না থাকায় তার আবেদন নেওয়া হয়নি, অথচ তার পাশের একজন এনআইডি না থাকা সত্ত্বেও দালালের মাধ্যমে আবেদন জমা দিতে পেরেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দালাল জানান, সাধারণ আবেদন তারা নিজেরাই অনলাইনে পূরণ করে জমা দেন। কিন্তু আবেদনে জটিলতা বা কাগজপত্রগত ক্রুটি থাকলে অফিসের ভেতরের অসাধু ব্যক্তিদের সাথে যোগসাজশ করে কাজ শেষ করতে হয়, যার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জটিল ফাইলের জন্য সর্বনিম্নে ১,০০০ টাকা করে ভেতরে দিতে হয় বলেও তারা জানান। তবে এসব যোগসাজশের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মৌলভীবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মোরাদ চৌধুরী। তিনি বলেন, "পাসপোর্ট অফিসে কোনো প্রকার অনিয়মের সুযোগ নেই। অফিসের কেউ দালাল চক্রের সাথে জড়িত হয়ে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন এমন অভিযোগের স্বপক্ষে কেউ প্রমাণ দিতে পারবেন না। তিনি আরও যোগ করেন এখানে দালাল চক্র রয়েছে এটা সত্য, তবে আবেদনকারী যদি সঠিক তথ্য নিয়ে আসেন তবে কাউকে ফেরত দেওয়া হয় না। সঠিক কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ফেরত পাঠানো হয়েছে এমন ঘটনা ঘটে না। আমি নিজে বিষয়টি সবসময় তদারকি করি। অফিস সূত্রে জানানো হয়েছে, প্রতিদিন গড়ে সেখানে প্রায় ১৩০টি আবেদন জমা পড়ে। বর্তমানে সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক প্রক্রিয়া চালু হওয়ায় অনিয়ম বা দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই বলেই দাবি কর্তৃপক্ষের।

