লামা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
ইয়াংছা উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি ফলে হতাশা ৫৭ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস মাত্র ১৫ জন, পাসের হার ২৬.৩২% শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ অভিভাবক ও সচেতন মহলে
বান্দরবানের লামা উপজেলার ইয়াংছা উচ্চ বিদ্যালয়ের এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল, অভিভাবক, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয় থেকে ৫৭ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র ১৫ জন। পাসের হার ২৬.৩২ শতাংশ। এমন ফলাফলে বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠদানের মান ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় ইয়াংছা উচ্চ বিদ্যালয় এলাকায় শৃঙ্খলা, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি
আগ্রহ এবং ভালো ফলাফলের জন্য পরিচিত ছিল। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল পড়াশোনার প্রতি আন্তরিকতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ। পাশাপাশি বিদ্যালয় পরিচালনায় সচেতন ও দায়িত্বশীল ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকা ছিল বলেও মনে করেন তারা। ভবন উন্নত হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষার মান কোথায়? স্থানীয় সচেতন মহলের কেউ কেউ আক্ষেপ করে বলছেন, বিদ্যালয়ের ভবন উপরের দিকে উঠলেও শিক্ষার মান ও পরীক্ষার ফলাফল যেন তলানির দিকে যাচ্ছে। তাদের মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু একটি বিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে মানসম্মত শিক্ষা, যোগ্য শিক্ষক, নিয়মিত পাঠদান, শৃঙ্খলা এবং শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের ওপর। অভিভাবকদের একটি অংশ মনে করছেন, বর্তমান ফলাফলকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ বের হবে না। বরং বিদ্যালয়ের পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষক সংকট, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং নিয়মিত একাডেমিক তদারকি সবকিছু পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষক সংকট নিয়ে প্রশ্ন বর্তমান ও প্রাক্তন কয়েকজন শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ গণিত ও ইংরেজি শিক্ষকসহ হিসাববিজ্ঞান, ফিন্যান্স ও অর্থনীতি বিষয়ের পর্যাপ্ত দক্ষ শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত একাডেমিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের মতে, এসএসসি পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত ও কার্যকর পাঠদান ব্যাহত হলে তার প্রভাব পরীক্ষার ফলাফলেও পড়তে পারে। তবে বিদ্যালয়ে বর্তমানে কোন কোন বিষয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে এবং অনুমোদিত পদের বিপরীতে কতটি পদ শূন্যতা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সঠিক নির্দেশনা ও গাইডের অভাবের অভিযোগ কয়েকজন বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীর মতে, শিক্ষার্থীদের শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করলেই হবে না; তাদের নিয়মিত পড়াশোনার রুটিন, পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতি, দুর্বলতা শনাক্তকরণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও সঠিক নির্দেশনা দিতে হবে। তাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত একাডেমিক গাইডলাইন ও ব্যক্তিগত মনোযোগের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের আলাদা করে চিহ্নিত করে অতিরিক্ত ক্লাস বা বিশেষ সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। জাহানারা আরজুর সময়ের কথা স্মরণ: বিদ্যালয়ের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জাহানারা আরজু-এর সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থার কথাও স্মরণ করছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও কয়েকজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী।তাদের ভাষ্য, তার সময়ে বিদ্যালয়ে জবাবদিহিতা, শৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশ তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। বিদ্যালয়ের শিক্ষা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে তার অবদানের প্রশংসা করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তারা। তবে স্থানীয়দের মতে, অতীতের ভালো দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতায় নতুন করে কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি।দায়ভার কে নেবে?উঠছে প্রশ্ন এবারের এসএসসি ফলাফল সামনে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে৫৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১৫ জন পাস করার পেছনে প্রকৃত কারণ কী? এটি কি শুধুই শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি, নাকি শিক্ষক সংকট, পাঠদানের দুর্বলতা, একাডেমিক তদারকির অভাব, শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি কিংবা ব্যবস্থাপনার কোনো ঘাটতিও এর সঙ্গে জড়িত?স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, কাউকে এককভাবে দায়ী না করে বিদ্যালয়ের গত কয়েক বছরের ফলাফল, শিক্ষক উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংখ্যা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার ফলাফল এবং পাঠদান কার্যক্রম পর্যালোচনা করলেই সমস্যার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। পরিস্থিতি উত্তরণে যেসব উদ্যোগ প্রয়োজন ইয়াংছা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও ফলাফল উন্নয়নে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সচেতন মহল কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ১. বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট নিরসন: গণিত, ইংরেজি, হিসাববিজ্ঞান, ফিন্যান্স ও অর্থনীতিসহ প্রয়োজনীয় বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগ/পদায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। ২. দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাস: যেসব শিক্ষার্থী নিয়মিত পরীক্ষায় পিছিয়ে রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে অতিরিক্ত ক্লাস ও বিশেষ একাডেমিক সহায়তা দিতে হবে। ৩. মাসিক একাডেমিক মূল্যায়ন: শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পরীক্ষা নিয়ে ফলাফল বিশ্লেষণ করতে হবে। কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষার্থী দুর্বল—তা চিহ্নিত করে শিক্ষকভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। ৪. এসএসসি প্রস্তুতিতে বিশেষ কর্মসূচি: নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য মডেল টেস্ট, বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা, প্রশ্ন সমাধান ও পরীক্ষার কৌশল নিয়ে বিশেষ প্রস্তুতি কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। ৫. শিক্ষক-অভিভাবক সমন্বয়: প্রতি মাস বা নির্দিষ্ট সময় পরপর অভিভাবক সভার আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, ফলাফল ও দুর্বলতার বিষয়ে অভিভাবকদের অবহিত করতে হবে। ৬. বিদ্যালয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নিয়মিত একাডেমিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা করতে হবে। ৭. শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা: বিতর্ক, কুইজ, গণিত প্রতিযোগিতা, ইংরেজি বক্তৃতা, বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রতিযোগিতা আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে হবে। ৮. প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা: প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি কার্যকর অ্যালামনাই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে বিদ্যালয়ের শিক্ষা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে তাদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। শুধু ভবন নয়, ফিরিয়ে আনতে হবে শিক্ষার পরিবেশ স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি বিদ্যালয়ের উন্নয়ন শুধু নতুন ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও ব্যবস্থাপনা—সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তাদের প্রত্যাশা, ইয়াংছা উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান ফলাফলকে সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক পর্যালোচনা করবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটি, অভিভাবক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের সমন্বয়ে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই একসময় যে ইয়াংছা উচ্চ বিদ্যালয় তার শিক্ষা ও ফলাফলের জন্য প্রশংসিত ছিল, সেই বিদ্যালয় কি আবারও তার পুরোনো সুনাম ফিরিয়ে আনতে পারবে?এখনই সময় ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করার, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। কারণ একটি বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ভবন নয় তার শিক্ষার্থীদের সাফল্য।

