সিলেট জেলা প্রতিনিধি
সিলেটের তাজরিয়ানের বিশ্বজয়, লেস্টারে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকার স্কলারশিপ
স্বপ্ন ছিল বিশ্বমানের প্রকৌশলী হওয়ার। সেই স্বপ্নকে বাস্তবতার পথে এগিয়ে নিতে এবার যুক্তরাজ্যের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব লেস্টারে পড়ার সুযোগ পেলেন সিলেটের তরুণ শিক্ষার্থী মো. তাজরিয়ান রশিদ। মেধা ও একাডেমিক যোগ্যতার ভিত্তিতে বিশ্বের নির্বাচিত মাত্র ৩০ শিক্ষার্থীর মধ্যে জায়গা করে নিয়ে তিনি অর্জন করেছেন তিন বছর মেয়াদি ব্যাচেলর অব ইঞ্জিনিয়ারিং (BEng) ইন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য বিশেষ স্কলারশিপ। স্কলারশিপটির মূল্য ৭৫ হাজার ৩০০ প
াউন্ড, বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এর আওতায় তাঁর তিন বছরের সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফ হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এমন প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ অর্জন তাজরিয়ানের দীর্ঘদিনের একাডেমিক প্রস্তুতি, মেধা ও অধ্যবসায়ের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন তাঁর পরিবার, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তাজরিয়ানের সাফল্যের গল্প অবশ্য এখানেই শুরু নয়। যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁর ধারাবাহিক সাফল্যের এটি দ্বিতীয় বড় স্বীকৃতি। এর আগে ২০২৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব প্লাইমাউথে BEng in Robotics Engineering পড়ার জন্য তিনি পেয়েছিলেন ৫০ শতাংশ মেধাভিত্তিক স্কলারশিপ। তিন বছরে ওই স্কলারশিপের মূল্য ছিল ২৮ হাজার ৮০০ পাউন্ড। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই একাডেমিক ক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে আসছেন তাজরিয়ান। ২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষায় তিনি অর্জন করেন জিপিএ ৪ দশমিক ৬১। এরপর বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ব্রিটিশ কারিকুলামে পরিবর্তন হয়ে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে আইএএল পড়াশোনা শুরু করেন। শিক্ষাব্যবস্থার এই পরিবর্তনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে তিনি অর্জন করেন উল্লেখযোগ্য সাফল্য। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও ফারদার ম্যাথমেটিকসে তাঁর ফলাফল যথাক্রমে A, A ও A । অসাধারণ এই ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন পিয়ারসন এডেক্সেল হাই অ্যাচিভার অ্যাওয়ার্ড। তবে তাজরিয়ানের সাফল্যের বিশেষ দিক হলো নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি অন্য শিক্ষার্থীদের নিয়েও কাজ করছেন তিনি। শিক্ষার্থীদের পড়ানো ও মেন্টরিংয়ের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে তুলেছেন অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম ‘এ-লেভেল ক্র্যাশ কোর্সেস (ALCC)। ALCC-এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের IGCSE ও A-Level পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও ফারদার ম্যাথমেটিকসে শিক্ষা এবং একাডেমিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। ফলে নিজের উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি অন্যদেরও আন্তর্জাতিক কারিকুলামে ভালো করার জন্য সহযোগিতা করছেন তাজরিয়ান। তাজরিয়ানের বাবা ইঞ্জিনিয়ার মো. হাসানুর রশীদ এবং মা রওশন রশীদ। পরিবারের তৃতীয় পুত্রের এই অর্জনে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত তাঁর পরিবার। আনন্দিত তাঁর শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও। সিলেটের একজন শিক্ষার্থীর এই আন্তর্জাতিক সাফল্য কেবল একটি স্কলারশিপ অর্জনের খবর নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনার একটি বার্তাও। বাংলা মাধ্যম থেকে ব্রিটিশ কারিকুলামে সফল রূপান্তর, বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলোতে শক্ত অবস্থান, প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়ে আগ্রহ এবং অন্য শিক্ষার্থীদের মেন্টরিং তাজরিয়ানের পথচলায় একসঙ্গে মিলেছে শিক্ষা, নেতৃত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতার নানা দিক। এখন তাঁর সামনে নতুন অধ্যায়। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লেস্টারে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে নিজের স্বপ্নকে আরও বিস্তৃত করতে যাচ্ছেন তাজরিয়ান। ভবিষ্যতে প্রযুক্তি ও প্রকৌশল ক্ষেত্রে তাঁর অর্জিত জ্ঞান দেশের কাজে লাগবে এমন প্রত্যাশাই তাঁর পরিবার, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের। তাজরিয়ানের গল্প তাই শুধু সিলেটের একটি পরিবারের আনন্দের গল্প নয়; এটি এমন এক তরুণের গল্প, যিনি প্রমাণ করছেন ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, মেধা, প্রস্তুতি ও অধ্যবসায়ই একজন শিক্ষার্থীর সম্ভাবনার প্রকৃত পরিমাপক।

