ক্রাইম রিপোর্টার মৌলভীবাজার
এবার কঠোর নজরদারিতে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতাল
মৌলভীবাজারে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা জোরদার এবং রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে এবার কেন্দ্রীয় নজরদারি জোরদার করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে জেলার সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মিজ তামান্না তাসনীমকে। গত ১৬ আগস্ট স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রশাসন-১ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়। সিনিয়র স
হকারী সচিব খন্দকার রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই আদেশে দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি হাসপাতাল তদারকির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে মৌলভীবাজার জেলার দায়িত্ব পান মিজ তামান্না তাসনীম। কেন এই নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ? সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি, রোগীদের সেবাপ্রাপ্তি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রাপ্যতা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে জনবল সংকট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি, সেবার সীমাবদ্ধতা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগও কম নয়।এ অবস্থায় মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তদারকি কার্যকর হলে শুধু কাগজে-কলমে নয়, হাসপাতালের বাস্তব চিত্রও সামনে আসবে এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। যেসব বিষয়ে থাকবে বিশেষ নজর তদারকির আওতায় চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা, ডিজিটাল হাজিরা এবং নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, অবকাঠামোর অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের বর্তমান পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করা হবে।শুধু হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নয়, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, প্রবীণ স্বাস্থ্যসেবা এবং পুষ্টি কার্যক্রমের অগ্রগতিও সরাসরি পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকবে। মাসে অন্তত একবার পরিদর্শন বাধ্যতামূলক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রতি মাসে অন্তত একটি বাধ্যতামূলক পরিদর্শন করতে হবে। পরিদর্শনে চিহ্নিত সমস্যা, পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ উল্লেখ করে পরবর্তী মাসের ৭ তারিখের মধ্যে সংশ্লিষ্ট শাখায় লিখিত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। অর্থাৎ, এবার হাসপাতালের অনিয়ম বা সীমাবদ্ধতা শুধু স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা নিয়মিতভাবে মন্ত্রণালয়ের নজরেও আসবে। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়েও গুরুত্ব তদারকি কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। ফলে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার পাশাপাশি সেগুলো সমাধানে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হবে। অভিজ্ঞ কর্মকর্তার হাতে দায়িত্ব মিজ তামান্না তাসনীম ৩৫তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-২ শাখায় দায়িত্ব পালনের আগে তিনি মাঠ প্রশাসনে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং বিভিন্ন উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি যদি নিয়মিতভাবে হাসপাতালের বাস্তব চিত্র পরিদর্শন ও প্রতিবেদন করেন, তাহলে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, জনবল সংকট, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি কিংবা ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা চিহ্নিত করার পথ আরও সহজ হতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। প্রশ্ন এখন বাস্তবায়ন নিয়ে তবে শুধু মন্ত্রণালয়ের আদেশ, পরিদর্শন কিংবা প্রতিবেদনেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। মূল বিষয় হলো পরিদর্শনে যে সমস্যাগুলো উঠে আসবে, সেগুলোর কতটা দ্রুত সমাধান হচ্ছে। হাসপাতালে চিকিৎসক আছেন কি না, থাকলে নিয়মিত রোগী দেখছেন কি না; প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আছে কি না, থাকলে সেগুলো সচল কি না; রোগীরা নির্ধারিত সেবা পাচ্ছেন কি না—এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তরই নির্ধারণ করবে এই কেন্দ্রীয় নজরদারি কতটা কার্যকর। মৌলভীবাজারবাসীর প্রত্যাশা, মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগ যেন আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। নিয়মিত তদারকি, বাস্তব সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার মান ফিরিয়ে আনা হোক। কারণ সরকারি হাসপাতাল শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয় হাজারো অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের শেষ ভরসার জায়গা। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্রীয় এই নজরদারি মৌলভীবাজারের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় কতটা দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে।

