ক্রাইম রিপোর্টার মৌলভীবাজার:
দীর্ঘ এক যুগের উপরে জেলা পরিষদে দুর্নীতি সাম্রাজ্যে গড়ে তুলেছেন উচ্চমান সহকারী এনামুল হক।
মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের উচ্চমান সহকারী মো. এনামুল হকের বিরুদ্ধে টেন্ডার, ইজারা ও আর্থিক লেনদেনে অনিয়মসহ একাধিক অভিযোগ দুর্নীতির প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। উনার কাছের চিহ্নিত মানুষদের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। সুবিধাবঞ্চিত সাধারণ ইজারাদারদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়,সরকারের রাজস্ব আয়ের ক্ষতিসাধন, অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতি এবং অফিসের বিভিন্ন কর্মচারীদের উপর জোরপূর্বক প্রভাব বিস্তার এবং জেলা পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমে বিধিবহির্ভূত কাজ করার অভিযোগ ও রয়েছে।
এসব বিষয়ে উর্ধতন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলোর কয়েকটি নিয়ে তদন্ত চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যেই তিনি উচ্চমান সহকারী থেকে প্রধান সহকারী পদে পদোন্নতির পেয়েছেন। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, সিলেটের স্থানীয় সরকার শাখার ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখের ০৫.৪৬,০০০০,০০০,০০৭.১২.০০০২.১৯.২৫২ নং স্মারক পত্রে তাকে পদোন্নতি দেয়া হয় । গত ১৪ মে ও ২০ মে দেওয়া লিখিত অভিযোগে জেলা পরিষদের বিভিন্ন জমি, খেয়াঘাট, পুকুর, কার পার্কিং ও অডিটোরিয়াম ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ইজারা রশিদ দেওয়ার সময় মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নেওয়ার কথা বলে ইজারাদারদের কাছ থেকে ঢাকা যাওয়া-আসার খরচ বাবদ আড়াই থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। কুলাউড়া ডাকবাংলোর সামনে রশিদ ছাড়াই ফলের দোকানদারদের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অডিটোরিয়াম লিজে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া অডিটোরিয়াম লিজ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, টেন্ডারের আগে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ও মাইকিং করার নিয়ম থাকলেও যথাযথভাবে মাইকিং করা হয়নি। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশেও কৌশলের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। শেরপুর মৎস্য আড়ৎ লিজের ক্ষেত্রে জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে অর্থ নেওয়া এবং ইছাপুর খেয়াঘাটের ইজারাদার নুর মিয়ার কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা নিয়েছেন এনামুল কিন্তু রাজস্ব খাতে জমা দেখানো হয়েছে মাত্র ১১ হাজার টাকা, নির্ধারিত রাজস্বের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও হিসাব যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মাধবকুণ্ডের কার পার্কিংয়ের অর্থ আদায় মাধবকুণ্ডের কার পার্কিংয়ের ইজারা অর্থ ও ‘খাস কালেকশন’ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। জেলা পরিষদের সাবেক সার্ভেয়ার শরিফ আহমেদ বলেন, টাকা জমা দেওয়া, রশিদ কাটা, ভাউচার নেওয়া ও অর্থ আদায় সব কাজ উচ্চমান সহকারী এনামুল হক একাই দায়িত্ব নিয়ে করতেন, আমাকে কোন সুযোগ দেয়া হতো না । উনার ভাষ্য অনুযায়ী, মাধবকুণ্ডের কার পার্কিংয়ের ইজারা টাকা আদায় ও খাস কালেকশনের কাজও উচ্চমান সহকারী করতেন। সার্ভেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এনামুল হক কর্তৃক বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথা জানান তিনি। উনার দাবি, ভূমি-সংক্রান্ত কারিগরি কাজের দায়িত্ব আমাকে দেয়ার কথা কিন্তু সে কাজগুলো আমাকে না দিয়ে উচ্চমান সহকারীকে দেওয়া হতো এবং সার্ভেয়ারদের দায়িত্ব পালনের কোন সুযোগ এনামুল হক দিতেন না । এই সকল কারণে আমার পূর্বের দুইজন সার্ভেয়ার এই অফিসে টিকতে পারেনি | দীর্ঘ সময় একই দপ্তরে থেকে এই প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে এনামুল হকের বিরুদ্ধে | অভিযোগকারীদের দাবি, একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন থাকার কারণে ইজারা টেন্ডার-সংক্রান্ত কাজে তাঁর প্রভাব তৈরি হয়েছে। জেলা পরিষদের টেন্ডার ও আর্থিক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাইরে বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কাছে বাহিরে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে জেলা পরিষদ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। অফিসে নিয়মিত উপস্থিত না থাকার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে টেন্ডার কার্যক্রম শুরু হলে রাত পর্যন্ত অফিসে থাকার কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া এনামুল হক ও তাঁর পরিবারের নামে থাকা সম্পদের উৎস নিয়েও অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন। তবে সম্পদের মালিকানা, পরিমাণ ও বৈধ উৎস সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করছেন মো. এনামুল হক। প্রশাসনের বক্তব্য মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান মিজান বলেন, অভিযোগগুলো আমার সময়ের নয়। আমি দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র চার মাস হয়েছে। তবে লিখিত কোনো অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—জেলা পরিষদের ইজারা, টেন্ডার, রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলোর নথি, রশিদ, ভাউচার ও সরকারি হিসাব যাচাই করে কোন আর্থিক অনিয়ম /রাজস্ব ক্ষতির প্রমাণ যেতে পারে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে তদন্ত, সরকারি নথি ও আর্থিক হিসাব যাচাইয়ের মাধ্যমে। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একজন উচ্চমান সহকারীর সল্প বেতন ভোক্ত কর্মচারী হয়েও বিলাসবহুল জীবনযাপনের পিছনের অর্থের উৎস কি আনিত অভিযোগ গুলো? তাই এখন জনমনে একটাই প্রশ্ন তদন্তের প্রতিফলন কি আসে? এখন তাই নজর তদন্তের ফলাফল এবং পদোন্নতির প্রস্তাব অনুমোদনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দিকে।

