স্টাফ রিপোর্টার
তখন প্রভাবশালী অংশীদার, এখন ফ্যাসিবাদবিরোধী নেতা
মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শামীমা খন্দকারের অপসারণ দাবিতে মানববন্ধন করেছেন জেলা পরিষদের একদল ঠিকাদার। উন্নয়ন প্রকল্পে প্রতিবন্ধকতা, ফাইল আটকে রাখা, হয়রানি ও আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ তুলে গত ১ অক্টোবর মৌলভীবাজার প্রেস ক্লাবের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। তবে মানববন্ধনের অন্যতম বক্তা ও ঠিকাদার তোয়েল আহমেদের অতীত ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা এবং বর্তমানে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ঘিরেও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। মানববন্ধনে তোয়েল আহমেদ, আনিছ
ুজ্জামান বায়েছসহ কয়েকজন ঠিকাদার বক্তব্য দেন। বক্তব্যে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা খন্দকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলা হয়। তাঁকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর বলেও মন্তব্য করেন বক্তারা। একই সঙ্গে পার্সেন্টেজ গ্রহণ, ফাইল আটকে রাখা এবং ঠিকাদারদের হয়রানির অভিযোগ তোলা হয়। তবে এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা খন্দকার। তাঁর বক্তব্য, অভিযোগগুলোর সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের আর্থিক অনিয়ম বা ব্যক্তিগত স্বার্থের সম্পৃক্ততা নেই। বরং একটি নির্দিষ্ট বিলকে কেন্দ্র করেই তাঁর বিরুদ্ধে এ মানববন্ধন আয়োজন করা হয়েছে। অনুমোদন নেই তাই বিল দেওয়া সম্ভব নয়’ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা খন্দকার বলেন, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, মৌলভীবাজারের ভবন নির্মাণ প্রকল্পে আর্থিক অনুমোদনের বাইরে থাকা কিছু কাজের বিল গ্রহণের জন্য ঠিকাদার তোয়েল আহমেদ তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন। কিন্তু সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদন, কার্যাদেশ, পরিমাপ ও প্রযোজ্য বিধিমালা অনুসরণ ছাড়া কোনো বিল পরিশোধ করা তাঁর পক্ষে আইনসঙ্গত নয়। তাঁর যুক্তি কোনো ঠিকাদারকে খুশি করতে গিয়ে যদি সরকারি বিধিমালা অমান্য করে বিল দেওয়া হয়, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভুল নয় সরকারি অর্থের জবাবদিহির প্রশ্নও তৈরি করবে তিনি আরও বলেন, কোনো কাজ বাস্তবে হয়েছে এটি একমাত্র বিল পরিশোধের যথেষ্ট ভিত্তি নয়। কাজটি অনুমোদিত কি না, কার্যাদেশে আছে কি না, বরাদ্দ রয়েছে কি না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন আছে কি না এবং সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী বিল পরিশোধের সুযোগ রয়েছে কি না এসব বিষয় যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ‘বিধির বাইরে গিয়ে কোনো বিল দিতে আমি রাজি নই। কোনো ঠিকাদার এতে অসন্তুষ্ট হলে সেটি আমার ব্যক্তিগত বিষয় নয়; সরকারি অর্থের দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার দায়িত্ব হলো বিধি মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া। বলেন তিনি। তোয়েল আহমেদের অতীত ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন এদিকে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জেলা পরিষদের অধীনে বাস্তবায়িত কয়েকটি বড় প্রকল্পে তোয়েল আহমেদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ ও তথ্য সামনে এসেছে। শ্রীমঙ্গল ও জুড়ী উপজেলায় জেলা পরিষদের চারতলা আধুনিক ডাকবাংলো এবং বড়লেখায় ৫০০ আসনবিশিষ্ট আধুনিক ডাকবাংলো নির্মাণ প্রকল্পসহ কয়েকটি কাজের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব ও সমঝোতার মাধ্যমে তিনি এসব কাজ বাস্তবায়নে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর মূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি বলে দাবি করা হয়েছে। কমলগঞ্জ উপজেলার আধুনিক ডাকবাংলোর কাজেও তৎকালীন পরিবেশ ও বনমন্ত্রীর আত্মীয় হিসেবে পরিচিত সুয়েব আহমেদের সঙ্গে তোয়েল আহমেদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব প্রকল্পে তাঁর সম্পৃক্ততা আইনবহির্ভূত ছিল কি না, কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কোনো সুবিধা নেওয়া হয়েছিল কি না তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট টেন্ডার, কার্যাদেশ, যৌথ উদ্যোগের চুক্তি, বিল-ভাউচার ও অন্যান্য সরকারি নথি যাচাই প্রয়োজন । তখন এক অবস্থান, এখন আরেক অবস্থান? সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে তোয়েল আহমেদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত বলে বিভিন্ন বক্তব্যে উল্লেখ করছেন এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিচ্ছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে ক্ষমতার সময়কার সম্পর্ক ও বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে এই পরিবর্তনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? তবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা বা কোনো সময়ের সরকারের আমলে ব্যবসা করা নিজে অপরাধ নয়। প্রশ্ন হচ্ছে সেই সময় সরকারি প্রকল্প পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সরকারি অর্থের কাজে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না এবং বর্তমানে সেই অতীত সম্পর্ক সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান কী। ডাকবাংলোর মান নিয়েও উঠছে অভিযোগ জুড়ী আধুনিক ডাকবাংলোসহ কয়েকটি প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোথাও কোথাও নামী ব্র্যান্ডের নামে পণ্য দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে ভেতরে ভিন্ন বা নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের প্রশ্ন রয়েছে। বৈদ্যুতিক ক্যাবল, ভবন নির্মাণের উপকরণ এবং এসির মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজন প্রকল্পের অনুমোদিত স্পেসিফিকেশন, টেন্ডার ডকুমেন্ট, সরবরাহকৃত পণ্যের মডেল ও সিরিয়াল, ক্রয়-বিল এবং কারিগরি পরীক্ষার প্রতিবেদন। সিইওর প্রশ্ন বিধির বাইরে বিল দেব কেন? প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা খন্দকারের বক্তব্যের মূল জায়গাটি হলো ব্যক্তি নয়, সরকারি বিধিমালাই তাঁর সিদ্ধান্তের ভিত্তি। তিনি বলেন, আমি কোনো ঠিকাদারের রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিবেচনা করে সরকারি অর্থের বিল দিতে পারি না। একটি কাজ অনুমোদিত না হলে, বরাদ্দ না থাকলে কিংবা বিধিমালার আওতায় বিল পরিশোধের সুযোগ না থাকলে সেই বিল দেওয়া সম্ভব নয়। আজ একজনের জন্য বিধি ভাঙলে আগামীকাল সেই সিদ্ধান্তের জবাবদিহি আমাকেই করতে হবে। তাঁর এ বক্তব্যের সঙ্গে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে ঠিকাদারদের অভিযোগ সত্য হলে তার প্রমাণ কোথায়, আর সিইওর বক্তব্য সত্য হলে বিধিবহির্ভূত বিলের দাবির নথিই বা কী? ফলে বিষয়টি এখন মানববন্ধন কিংবা পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বাধীন প্রশাসনিক তদন্ত, প্রকল্পভিত্তিক নথি যাচাই এবং প্রয়োজন হলে কারিগরি অডিটের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পে আসল প্রশ্ন কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয় কে কোন সময়ে কার সঙ্গে ছিলেন, সেটিও নয়; বরং জনগণের অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কোন মানে ব্যয় হয়েছে শেষ পর্যন্ত সেই হিসাবই জনগণের সামনে পরিষ্কার হওয়া দরকার।

