আরিফ আহমেদ সিলেট প্রতিনিধি:
ইউরোপে বসেও সরকারি বেতন কোম্পানীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪ স্বাস্থ্যকর্মীর দীর্ঘ অনুপস্থিতি
কেউ তিন বছরের বেশি সময় ধরে কর্মস্থলে নেই, কেউ অনুপস্থিত প্রায় চার বছর। তাঁদের কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ইউরোপে অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ। অথচ সরকারি চাকরির খাতায় তাঁরা এখনো বহাল। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চার স্বাস্থ্যকর্মীর দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার ঘটনায় এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অনুপস্থিত চারজনের মধ্যে তিনজনই নার্সিং পেশায় কর্মরত এবং একজন মিডওয়াইফ। তাঁদের দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ নার্স
িং সেবায় জনবল সংকট তৈরি হয়েছে। কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত থাকা অন্য নার্সদের অতিরিক্ত দায়িত্ব ও কাজের চাপ সামলাতে হচ্ছে। এতে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন সিনিয়র স্টাফ নার্স মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম। হাসপাতাল সূত্র বলছে, তিনি ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। অর্থাৎ প্রায় চার বছর ধরে তাঁর নিয়মিত দায়িত্ব পালনের তথ্য নেই। আরেক সিনিয়র স্টাফ নার্স রুহুল আমীন ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। তাঁর অনুপস্থিতির সময়ও প্রায় তিন বছর হতে চলেছে। এ ছাড়া মিডওয়াইফ সুবি বেগম ২০২৩ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে কর্মস্থলে আসছেন না। অন্যদিকে সিনিয়র স্টাফ নার্স মান্না বেগমের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ইউরোপে অবস্থানের অভিযোগ চার স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে কয়েকজন সরকারি চাকরি বহাল রেখেই সপরিবারে ইউরোপে অবস্থান করছেন এমন অভিযোগও উঠেছে। তবে তাঁরা কোন ধরনের সরকারি বা বিধিসম্মত ছুটিতে রয়েছেন কি না, বিদেশে অবস্থানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন রয়েছে কি না এবং দীর্ঘ অনুপস্থিতির সময় তাঁদের বেতন-ভাতা কীভাবে পরিশোধ হয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকেও একজন সরকারি কর্মচারী কীভাবে বছরের পর বছর চাকরিতে বহাল থাকেন? যদি তাঁরা বৈধ ছুটিতে থাকেন, তাহলে সেই ছুটির অনুমোদন কে দিয়েছেন এবং কত দিনের জন্য? আর যদি অনুমোদিত ছুটি না থাকে, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে এতদিনে কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এ প্রশ্নও সামনে এসেছে। জনবল সংকটে বাড়ছে চাপ কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি উপজেলার প্রত্যন্ত ও সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে এখানে আসেন। বিশেষ করে নার্সিং সেবার ওপর নির্ভরশীল রোগী ও প্রসূতিদের জন্য পর্যাপ্ত জনবল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী দীর্ঘদিন কর্মস্থলে না থাকায় বিদ্যমান জনবল দিয়ে সেবা চালিয়ে যেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে হাসপাতালসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী জানান, দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি পদ কার্যত শূন্য পড়ে থাকায় কর্মরতদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব পড়ছে। একজনের অনুপস্থিতির দায়িত্ব অন্যজনকে সামলাতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক কর্মঘণ্টার বাইরে কাজের চাপও বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের ওপর সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। সেখানে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে রোগীদের ওপর। তাঁদের প্রশ্ন, একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী দীর্ঘদিন কর্মস্থলে না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত হাজিরা, ছুটির নথি ও বেতন-ভাতার বিষয়গুলো কীভাবে তদারকি করছেন? নজরদারি কোথায়? সরকারি চাকরিতে কর্মস্থলে উপস্থিতি, ছুটি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অংশ। কোনো কর্মী দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে তাঁর অনুপস্থিতির কারণ যাচাই, ছুটির বৈধতা পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চার স্বাস্থ্যকর্মীর ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে যদি দীর্ঘ অনুপস্থিতির পরও তাঁদের বেতন-ভাতা নিয়মিত হয়ে থাকে, তাহলে সেটি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কর্মস্থলে বাস্তবে দায়িত্ব পালন না করে সরকারি অর্থে বেতন-ভাতা গ্রহণ করা হয়ে থাকলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অনুপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আসে। তদন্তের দাবি স্থানীয়দের দাবি, চার স্বাস্থ্যকর্মীর কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। তাঁদের ছুটির আবেদন, অনুমোদনপত্র, হাজিরা খাতা, বেতন-ভাতা উত্তোলনের তথ্য এবং বিদেশে অবস্থানের বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন তাঁরা দায়িত্বে না থাকলে এতদিনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তাও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। কারণ, সরকারি হাসপাতালের একটি নার্সিং পদ শুধু একটি চাকরির পদ নয় এর সঙ্গে যুক্ত থাকে একজন রোগীর সেবা পাওয়ার অধিকার। একজন স্বাস্থ্যকর্মীর দীর্ঘ অনুপস্থিতি যখন অন্যদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে এবং রোগীসেবায় প্রভাব ফেলে, তখন বিষয়টি প্রশাসনিক ফাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রশাসনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

