মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
হাসপাতাল আছে,অপ্রতুল সেবা, চিকিৎসা জটিল হলেই গন্তব্য সিলেট!
হাসপাতালের ভবন আছে, শয্যা আছে, রোগীর চাপ আছে কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নেই। জেলার সাত উপজেলার প্রায় সাড়ে ২১ লাখ মানুষের সরকারি চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল। প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় দুই হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে এলেও দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা। আর রোগ কিছুটা জটিল হলেই অনেক রোগীর গন্তব্য হয়ে উঠছে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বলছে, অনুমোদিত ৮৪ট
ি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৪০ জন। শূন্য রয়েছে ৪৪টি পদ। এর মধ্যে চর্ম ও যৌনরোগ, হৃদ্রোগ, চক্ষু, গাইনি, শিশুরোগ এবং নাক-কান-গলা বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিনিয়র কনসালটেন্টের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বিভিন্ন বিভাগে পদায়ন না হওয়ায় বিশেষায়িত চিকিৎসার চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শুধু চিকিৎসক নয়, নার্স ও অন্যান্য জনবল সংকটও প্রকট। অনুমোদিত ৪০৯ জন জনবলের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩০৬ জন। অর্থাৎ ১০৩টি পদই শূন্য। এর মধ্যে ১৮৭টি নার্স পদের বিপরীতে কর্মরত ১৭১ জন; শূন্য ১৬টি পদ। ফলে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে সংকটে পড়ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। রোগীদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা মিলছে না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে জটিল রোগীকে সিলেটে রেফার করা হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন নিম্নআয়ের ও প্রান্তিক রোগীরা। একদিকে বাড়ছে চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয়, অন্যদিকে অসুস্থ রোগীকে নিয়ে স্বজনদের পাড়ি দিতে হচ্ছে দীর্ঘ পথ। জরুরি ও জটিল রোগীদের ক্ষেত্রে এই দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অ্যানেসথেশিয়া বিভাগেও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞের ঘাটতি রয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সব ধরনের অস্ত্রোপচার নিয়মিত করা সম্ভব হচ্ছে না। জটিল রোগীদের শেষ পর্যন্ত পাঠাতে হচ্ছে সিলেটে। ৫০০ শয্যার স্বপ্ন, ১০৩ পদই শূন্য রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যা থেকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি পাঠায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাস০ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে হাসপাতালের অবকাঠামো সম্প্রসারণ, গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল পদায়ন এবং ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে সিসিইউ, আইসিইউ, কার্ডিওলজি, নিউরোলজি, নেফ্রোলজি, ইউরো সার্জারি, নিউরো সার্জারি, নিওনেটাল, ডার্মাটোলজি, হেমাটোলজি, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও শিশু সার্জারিসহ মোট ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়। কিন্তু চিঠি দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব উদ্যোগে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ৫০ শয্যা থেকে ২৫০, এরপরও সংকট কাটেনি ১৯৮৪ সালে মাত্র ৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা হাসপাতালটি ২০০৩ সালে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। পরে নতুন ভবন নির্মাণের মাধ্যমে ২০১২ সালে হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু শয্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে চিকিৎসক ও জনবল বাড়েনি এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে হাসপাতালের অবকাঠামো সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারিত হয়নি। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে মৌলভীবাজারে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবিও রয়েছে। দেশে ও প্রবাসে এ দাবিতে সভা-সেমিনার, মানববন্ধন, প্রচারাভিযান ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি হয়েছে। তবে মেডিকেল কলেজের দাবি পূরণ তো দূরের কথা, জেলার প্রধান সরকারি হাসপাতালের বিদ্যমান জনবল সংকটই এখনো কাটেনি। ড্যাব মৌলভীবাজার জেলা শাখার সদস্য সচিব ডা. আব্দুল হাদী শাহীন বলেন, চিকিৎসক সংকট দেশের বিভিন্ন হাসপাতালেই রয়েছে। তবে যারা কর্মরত আছেন, তাদের আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং হাসপাতালকে দালালমুক্ত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন। মৌলভীবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ূন বলেন, মেডিকেল কলেজের দাবির পাশাপাশি ২৫০ শয্যার হাসপাতালের প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, জনবল ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাস বলেন, রোগীদের সুষ্ঠু চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে জনবল সংকট।” তাঁর মতে, আইসিইউ, সিসিইউসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা চালু করা গেলে চিকিৎসাসেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব।ভবন বড় হচ্ছে, রোগীর চাপ বাড়ছে কিন্তু চিকিৎসক কোথায়?মৌলভীবাজারবাসীর প্রশ্ন এখন একটাই২৫০ শয্যার হাসপাতালে যদি ৪৪টি চিকিৎসক পদই শূন্য থাকে, তাহলে ৫০০ শয্যায় উন্নীত হলে সেই অতিরিক্ত রোগীর চিকিৎসা দেবেন কারা? জেলার মানুষ মেডিকেল কলেজ চান, আধুনিক হাসপাতাল চান, উন্নত চিকিৎসা চান। কিন্তু তার আগে বিদ্যমান হাসপাতালটির শূন্য পদ পূরণ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ এবং আইসিইউ-সিসিইউসহ জরুরি চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।নইলে হাসপাতালের শয্যা বাড়বে, ভবন বাড়বে কিন্তু জটিল রোগী দেখলেই যদি বলতে হয় ‘সিলেটে নিয়ে যান তাহলে জেলার মানুষের জন্য সরকারি চিকিৎসাসেবার এই প্রধান ভরসাস্থল কতটা কার্যকর সেই প্রশ্ন থেকেই যাবে।

