নিউজ ডেক্স:
তেলের দাম বাড়ে, প্রশ্নও বাড়ে. জনগণের পকেট কি সব সংকটের শেষ ঠিকানা?
রিজিকে হাত পড়লে মানুষ প্রতিবাদ করে এ সত্য নতুন নয়। কিন্তু রাষ্ট্র যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানির দাম বাড়ায়, তখন সেই প্রতিবাদকে শুধু রাজনৈতিক চিৎকার বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ তেলের দাম শুধু একটি পণ্যের দাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবহন, কৃষি, শিল্প, পণ্য পরিবহন, বাজারদর এবং শেষ পর্যন্ত একটি পরিবারের মাসিক খরচের হিসাব। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে দেশে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিন চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫,
অকটেন ১৬৫, পেট্রোল ১৬০ এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা। মার্চের দরের সঙ্গে তুলনা করলে ডিজেলে ৩৫, অকটেনে ৪৫, পেট্রোলে ৪৪ এবং কেরোসিনে ৪৩ টাকা বৃদ্ধি দাঁড়ায়। সরকারের ব্যাখ্যার জায়গাটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনও মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বড় ধরনের আর্থিক চাপের কথা জানিয়েছে। কিন্তু এখানেই তো আসল প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব জনগণকে নিতে হবে যদি নীতি হয়, তাহলে দাম কমলে তার সুফল জনগণ কত দ্রুত এবং কতটা পাবে? স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার যুক্তি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয়, কর-শুল্ক, ডলারের বিনিময় হার, বিপিসির মার্জিন, ভ্যাট ও বিতরণ ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে দেশের বাজারে দাম সমন্বয় করা। তাহলে জনগণের প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক দাম বাড়ানোর সূত্র যদি স্বচ্ছ হয়, সেই সূত্রের পূর্ণ হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা হবে না কেন? কত দামে তেল কেনা হচ্ছে? আমদানি ও পরিবহন ব্যয় কত? কর-শুল্ক কত? বিপিসির মার্জিন কত? সরকারের ভর্তুকি বা ক্ষতির পরিমাণ কত? আর শেষ পর্যন্ত একজন ভোক্তার কাছ থেকে নেওয়া প্রতি লিটারের টাকার কত অংশ কোন খাতে যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, হিসাবের খাতায় দিতে হবে। অর্থাৎ তেলের দাম বাড়ানোর অভিঘাত পাম্পে শুরু হয়ে রান্নাঘরে গিয়ে শেষ হয়। তাই কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী, সমর্থক কিংবা বিরোধী পক্ষ যেই হোক, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলার সময় দলীয় চশমা খুলে মানুষের চোখ দিয়ে বিষয়টি দেখা প্রয়োজন। কেউ যদি মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি দেন, তাকে শত্রু বানানোর প্রয়োজন নেই। আবার কেউ যদি মূল্যবৃদ্ধির বিরোধিতা করেন, তাকেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বাতিল করে দেওয়ার সুযোগ নেই। গণতন্ত্রে প্রশ্ন করার অধিকার যেমন আছে, তেমনি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্বও আছে। আজ যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি জরুরি, সেটি হলো রাষ্ট্রের রাজস্ব, বিপিসির লোকসান, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য কোথায়? রাষ্ট্র যদি বলে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, জনগণ বলবে—ঠিক আছে, কিন্তু চাপ ভাগ হবে কীভাবে? রাষ্ট্র যদি বলে বিপিসি লোকসানে, জনগণ বলবে লোকসানের কারণ কী, ব্যবস্থাপনার কোথায় ঘাটতি, এবং সেই ঘাটতির পুরো বোঝা কি ভোক্তার ঘাড়েই দিতে হবে? রাষ্ট্র যদি বলে বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে, জনগণ বলবে বিশ্ববাজারে কমার সময়ও কি একই স্বচ্ছতা ও গতিতে দাম কমানো হবে? এই প্রশ্নগুলো কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়। এগুলো জবাবদিহির প্রশ্ন। রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা তখনই তৈরি হয়, যখন জনগণের কষ্টকে দলীয় লাভ-ক্ষতির অঙ্কে মাপা শুরু হয়। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, যে দলই বিরোধিতায় থাকুক জনগণের পকেট কারও রাজনৈতিক সম্পদ হতে পারে না। রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনার অর্থ কোথা থেকে আসে, কর্মীদের ব্যয় কীভাবে চলে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অর্থায়ন কীভাবে হয়এসব নিয়েও সমাজে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট দলের নেতাকর্মীদের পকেটে জ্বালানি তেলের বাড়তি টাকা যাচ্ছে এমন অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সাংবাদিকতার কাজ নয়। বরং সাংবাদিকতার কাজ হলো প্রশ্নটি এমনভাবে তোলা, যাতে যে অর্থ জনগণের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে, তার প্রতিটি স্তরের হিসাব জনসমক্ষে আসে। কারণ জনগণের টাকা মানেই জনগণের প্রশ্ন। আজ তেলের দাম ২০ টাকা বাড়ল। কাল হয়তো কোনো পণ্যের দাম বাড়বে, পরশু পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এভাবে যদি মানুষের আয় একই থাকে অথচ ব্যয়ের খাতা প্রতিদিন মোটা হতে থাকে, তাহলে একসময় মানুষ শুধু বাজারে পণ্য কিনবে না নিজের জীবনের হিসাবও করতে বসবে। তখন প্রশ্ন হবে রাষ্ট্র কি শুধু মূল্য বাড়ানোর খবর দেবে, নাকি জনগণকে মূল্যবৃদ্ধির পূর্ণ হিসাবও দেবে? জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়তো অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সেই বাস্তবতার বোঝা কীভাবে বণ্টিত হবে সেটিই আসল রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন। কারণ রাষ্ট্রের অর্থনীতি যদি মানুষের জন্য হয়, তাহলে অর্থনীতির শেষ হিসাবটিও মানুষের কাছেই দিতে হবে। তেলের দাম বাড়তে পারে। বিশ্ববাজার অস্থির হতে পারে। রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়তে পারে। কিন্তু জনগণের প্রশ্ন করার অধিকার কমতে পারে না। আর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো মানুষের পকেটকে রাষ্ট্রের সহজতম সমাধান মনে করলে একসময় সেই পকেটই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসে।

