নিউজ ডেক্স
বিএনপির পরবর্তী মহাসচিবের দৌড়ে রিজভীসহ একঝাঁক শীর্ষ নেতা
দীর্ঘদিন পর জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি ঘিরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে নতুন নেতৃত্বের হিসাব-নিকাশ। চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে দলের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে এমন আলোচনা সামনে আসার পর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে একটি প্রশ্ন—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পর বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব হচ্ছেন কে? দলের বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০১১ সালে তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়
িত্ব পান এবং ২০১৬ সালের কাউন্সিলে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিকবার কারাবরণসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে বিএনপির ভেতরে তাঁর একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থান তৈরি হয়েছে। তবে এবার তাঁর রাজনৈতিক দায়িত্বে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। আগামী ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করার খবর সামনে আসার পর দলের মহাসচিব পদে পরিবর্তনকে অনেকেই প্রায় অনিবার্য হিসেবে দেখছেন। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জাতীয় কাউন্সিল এবং দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ওপরই নির্ভর করবে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। দীর্ঘ সময় ধরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন এবং দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে পরিচিত মুখে পরিণত করেছে। দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও অতীতের নজির বিবেচনায়ও রিজভীর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বিএনপির ইতিহাসে একাধিকবার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার নজির রয়েছে। পরে দলের জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে সেই দায়িত্ব পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা অনুসরণ করা হলে মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য পদত্যাগ বা দায়িত্ব পরিবর্তনের পর রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেতে পারেন বলে দলীয় অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রুহুল কবির রিজভীর সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে দলের তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সরাসরি যোগাযোগকে। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কেন্দ্রিক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের সময় দলীয় কর্মসূচি ঘোষণা, বাস্তবায়ন এবং গণমাধ্যমে দলের বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রেও রিজভীকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। দলের কঠিন সময়গুলোতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করে দলীয় অবস্থান তুলে ধরার কারণে তিনি বিএনপির অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত হয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা শীর্ষ নেতাদের তুলনায় সংগঠনের সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে যুক্ত এমন একজন নেতাকে মহাসচিব করা হলে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হতে পারে। আলোচনায় সালাহউদ্দিন, আমীর খসরুসহ অন্যরাও তবে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে শুধু রুহুল কবির রিজভীর নামই নয়, আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতার নামও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় রয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং যুগ্ম মহাসচিব শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানির নামও সম্ভাব্য মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। সালাহউদ্দিন আহমেদ বিএনপির স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। অন্যদিকে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। হাবিব উন নবী খান সোহেল ও শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানিরও রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ। ফলে নতুন মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু জ্যেষ্ঠতা নয়, সাংগঠনিক দক্ষতা, তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দলের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার সক্ষমতাও বিবেচনায় আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চেয়ারম্যানের সঙ্গে সমন্বয়ই বড় বিষয় বিএনপির একাধিক স্থায়ী কমিটির সদস্যের মতে, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকলে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একজন পূর্ণকালীন ও সক্রিয় মহাসচিব প্রয়োজন হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বে থাকা কোনো নেতার পরিবর্তে দলকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় এবং সাংগঠনিক বিষয়ে দক্ষ কাউকে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু এবং যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের বক্তব্যেও এমন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাদের মতে, দলের স্বার্থে ত্যাগী, কর্মীবান্ধব, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এবং চেয়ারম্যানের সঙ্গে সহজে সমন্বয় করে কাজ করতে সক্ষম এমন একজন নেতাকেই গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। ক্ষমতায় এসে নতুন চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতি করার পর বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে দল ও সরকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা হবে দলের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কাঠামো সক্রিয় রাখা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা পূরণে মহাসচিবের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচন শুধু একটি সাংগঠনিক পদ পূরণের বিষয় নয়; বরং বিএনপির ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গেও এটি সরাসরি সম্পর্কিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সম্ভাব্য নতুন দায়িত্বকে ঘিরে বিএনপির মহাসচিব পদে রদবদলের আলোচনা এখন দলীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। সম্ভাব্য নামের তালিকায় রুহুল কবির রিজভী এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও জাতীয় কাউন্সিলের ওপর। তাই কাউন্সিলের সময় যত ঘনিয়ে আসবে, মহাসচিব পদ ঘিরে দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণও তত স্পষ্ট হয়ে উঠবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

