মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
কুলাউড়ার মুরইছড়া চা-বাগানে দৈনিক ৫০০ মজুরি বৃদ্ধিতে কর্মসূচি
মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার মুরইছাড়া চা বাগানে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেন- চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র ৯.৩৭ টাকা মজুরি বৃদ্ধি প্রত্যাখ্যান করে ৫% মজুরি বৃদ্ধির গেজেট বাতিল করে চা-শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের দাবিতে আজ ১৪ আগস্ট ২০২৬, চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র'র উদ্যোগে কুলাউরা উপজেলার মুরইছড়া চা-বাগানে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মুরইছড়া চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি ও চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র" র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জয়কৃষানের সভাপ
তিত্বে এবং কেন্দ্রীয় সদস্য সত্যজিৎ উরাং এর সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক এস এম শুভ, সমন্বয়ক মনীষা ওয়াহিদ, শ্রমিকনেতা ভাগ্য, রাজু উরাং, মনি নায়েক, মালতি রায় প্রমুখ। সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে অবহেলিত, বঞ্চিত এবং চরম রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার চা-শ্রমিকরা। স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও নাগরিক মৌলিক অধিকার থেকে চা-জনগোষ্ঠী আজও বঞ্চিত। ১৮৫ বছর ধরে এ ভূখণ্ডে বসবাস করলেও তারা এখনো ভূমিহীন, দেশের সবচেয়ে কম মজুরিতে কাজ করেন চা-শ্রমিকরা,বর্তমানে তাঁদের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা একজন চা-শ্রমিক সপ্তাহে ১,৩০৯ টাকা এবং মাসে মাত্র ৫,২৩৬ টাকা আয় করেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৬ সালের ১০ জুনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণের মাসিক গড় আয় ৩০,৭৩৯ টাকা (২৫১.৬৬ ডলার)। এই পরিসংখ্যান থেকে চা-শ্রমিকদের চরম আয় বৈষম্যের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো কোনো বাগানে ২৩ কেজি, এমনকি ২৪-২৫ কেজি পাতা উত্তোলন করলেই কেবল দৈনিক হাজিরা নিশ্চিত হয়। বিশ্বের অন্যতম চা-উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও সবচেয়ে কম মজুরি পান বাংলাদেশের চা-শ্রমিকরা। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি আসাম সরকার চা-শ্রমিকদের মজুরি ৩০ টাকা বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়। এতে আসামের ব্রহ্মপুত্র ভ্যালির নতুন মজুরি নির্ধারিত হয় ৩৫৮ টাকা (২৮০ রুপি) এবং বরাক উপত্যকায় ৩৩০ টাকা (২৫৮ রুপি)। ভারতের অন্যান্য রাজ্য, যেমন—কেরালাতে সর্বোচ্চ ৪২১ রুপি, তামিলনাড়ুতে ৪০৬ রুপি এবং কর্ণাটকে ৩৭৬ রুপি মজুরি পেয়ে থাকেন চা-শ্রমিকরা। এছাড়া শ্রীলঙ্কায় দৈনিক প্রায় ৫৫০ টাকা এবং কেনিয়ায় ৪৮৩ টাকা মজুরি পান তারা। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী চা-শ্রমিকদের মজুরি ৫ শতাংশ হারে বাড়ে, যা মাত্র ৮ টাকা। অথচ দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ সবকিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী, তখন এই ৮ টাকা মজুরি বৃদ্ধি চা-শ্রমিকদের সাথে চরম এক প্রহসন। যেখানে একটা ডিমের দাম ১২ টাকার বেশি, একটি পানের খরচ ১০ টাকা, এক কাপ চায়ের দাম ১০-১৫ টাকা, সেখানে মাত্র ৮ টাকা মজুরি বাড়ানো অত্যন্ত অমানবিক। স্বার্থবিরোধী গেজেট প্রকাশের পর থেকেই চা-শ্রমিকরা তা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে মজুরি বৃদ্ধির দাবি এখনো উপেক্ষিত। সম্প্রতি কুলাউড়া সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য চা-শ্রমিকদের মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের জন্য সংসদে সিদ্ধান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য এ বিষয়ে আলোচনা করেন। শ্রমমন্ত্রী মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় আছে বলে আশ্বস্ত করলে সংসদ সদস্য প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু তার কয়েকদিন পরেই শ্রমমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, চা-শ্রমিকরা হাজিরার বাইরেও নানা সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন, যা অন্য খাতের শ্রমিকরা পান না। প্রকৃতপক্ষে, এটি বাগান মালিকদের একটি অপপ্রচার, যা বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়ে থাকে। এছাড়া চা-শিল্পের উন্নয়নে বাগান মালিকদের সাথে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নানা প্রতিশ্রুতি দেন এবং টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেন। তবে চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় বাগানগুলোতে চা-জনগোষ্ঠীর মাঝে চরম হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। চা উৎপাদনে প্রতি বছর নতুন রেকর্ড হলেও বাঁচার মতো ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হচ্ছে না। মালিকরা কেবল লোকসানের খবর প্রচার করেন। চা বোর্ড ২০২৬ সালের জন্য ১০ কোটি ২৬ লাখ কেজি চা পাতা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। প্রথম চার মাসেই গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে ১৩০ গুণ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে দেশে মোট ৯০ লাখ ৭৩ হাজার কেজি চা পাতা উৎপাদিত হয়েছে; যেখানে আগের বছর একই সময়ে উৎপাদন ছিল ৩৯ লাখ ৭৬ হাজার কেজি। শুধু উৎপাদন নয়, নিলামেও চা পাতার দাম বেড়েছে। চলতি নিলাম বর্ষে ২৭ এপ্রিল শুরু হওয়া চট্টগ্রামের প্রথম নিলামে কেজিপ্রতি চা গড়ে ২৭৪ টাকায় বিক্রি হয়। নিলামে মূল্য বাড়লেও বাগান মালিকরা লোকসানের দোহাই দিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে নারাজ। সরকারের ভূমিকা বরাবরের মতোই মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২২ সালে মজুরি ৫০ টাকা বাড়লে চা-শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি (অ্যারিয়ার) দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ হাজার টাকা। কিন্তু মালিকরা সরকারের সাথে যোগসাজশ করে মাত্র ১১ হাজার টাকা তিন কিস্তিতে পরিশোধ করেন। ফলে একজন শ্রমিক তাঁর নিজের উপার্জিত ২২ হাজার টাকার পাওনা থেকে বঞ্চিত হন। এভাবে প্রায় ১ লাখ চা-শ্রমিককে তাঁদের প্রাপ্য টাকা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। চা-শ্রমিকদের বঞ্চনার ইতিহাস এখনো চলমান। ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির গেজেট বাতিল করে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি নির্ধারণের দাবিতে চা-শ্রমিকরা বাগানে বাগানে বিক্ষোভ করছেন। চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি চলছে। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য চা-শ্রমিকদের যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধি (সিবিএ), অর্থাৎ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির দায় রয়েছে। দীর্ঘ ৮ বছর নির্বাচন না হওয়ায় চা-শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ফলে অধিকার আদায়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ বা ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অন্তরায়। তাই চা-শ্রমিকরা আজ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধির দাবি তুলেছেন। সমাবেশে সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রধান সমন্বয়ক এস এম শুভ বলেন, ২০২২ সালের আগস্ট মাসে চা-শ্রমিকরা দীর্ঘ ১৯ দিন খেয়ে-না খেয়ে রাজপথে লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমেই মজুরি বাড়িয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় মদদে শ্রমিক শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করেই অধিকার আদায় করে নিতে হবে। চা-শ্রমিকরা আজ অধিকার আদায়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। সংসদে নয়, চা-শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাবে রাজপথের লড়াইয়ের মাধ্যমেই।

