মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
কানাডায় স্ত্রী-সন্তান, দেশে গোপন বিয়ের আয়োজন!
মৌলভীবাজারের এক কানাডা প্রবাসীর বিরুদ্ধে বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল রেখেই স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া গোপনে দ্বিতীয় বিয়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় কানাডাপ্রবাসী স্ত্রী পারভিন তারাফদার মৌলভীবাজার মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের সংসার, সন্তান ও পারিবারিক সম্পর্ক উপেক্ষা করে তার স্বামী হান্নান আহমেদ পুনরায় বিয়ের উদ্যোগ নিয়েছেন, যা তাকে চরম মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিক অপমানের মুখে ফেলেছে। থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার শহরের পুরাতন
হাসপাতাল রোড এলাকার মৃত ইসহাক মিয়ার ছেলে হান্নান আহমেদের সঙ্গে ১৯৯৫ সালের ৪ ডিসেম্বর কানাডায় আইনগতভাবে পারভিন তারাফদারের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর তারা দীর্ঘদিন ধরে সন্তানসহ কানাডার সাসকাচুয়ান প্রদেশে বসবাস করে আসছিলেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, তাদের দাম্পত্য জীবন দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক ও সম্মানজনকভাবে চললেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হান্নান আহমেদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয়। পারভিন তারাফদারের দাবি, কিছুদিন আগে তিনি জানতে পারেন তার স্বামী অন্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, কয়েক বছর পূর্বে হান্নান আহমেদ গোপনে বাংলাদেশে আরেকটি বিয়ে করেছিলেন। সে সময় বিষয়টি পারিবারিকভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হয় এবং পরিবারের সদস্যরা তাকে ভবিষ্যতে এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান। তবে সেই প্রতিশ্রুতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি বলেই অভিযোগ স্ত্রীর। অভিযোগ অনুযায়ী, তিন থেকে চার মাস আগে হান্নান আহমেদ ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরব যান। ওই সময় তিনি স্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন যে অতীতের ভুল আর পুনরাবৃত্তি হবে না এবং সংসার ভাঙনের মতো কোনো পদক্ষেপ তিনি নেবেন না। কিন্তু সম্প্রতি পারভিন তারাফদার নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পারেন, তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক আইনগতভাবে বহাল থাকা অবস্থায় গত ১৮ মে বাংলাদেশে আবারও বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তার স্বামী। এই সংবাদ পাওয়ার পরই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন। একজন স্ত্রী ও সন্তানের মা হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতারিত, অপমানিত ও অসহায় মনে করছেন বলেও অভিযোগে তুলে ধরেন। তার ভাষ্য, বিদেশের মাটিতে দীর্ঘদিন ধরে সংসার ও সন্তান সামলানোর পর এমন আচরণ তাকে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত হান্নান আহমেদের ভাই মান্নান আহমেদ মোবাইল ফোনে বলেন, “বিষয়টি হান্নান আহমেদের ব্যক্তিগত বিষয়। তার সঙ্গে সরাসরি কথা বললেই ভালো হয়।” তবে হান্নান আহমেদের বাংলাদেশি মোবাইল নম্বর চাইলে তিনি জানান, তার কাছে কোনো স্থানীয় নম্বর নেই। পরে তিনি সাংবাদিককে তার অফিসে এসে কথা বলার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত হান্নান আহমেদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট হওয়া সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় মৌলভীবাজার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “থানায় একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। খবর পাওয়ার পর ঘটনাটি যাচাইয়ে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” আইনজীবীদের মতে, বাংলাদেশের পারিবারিক আইন অনুযায়ী প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। বিশেষ করে বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল রেখে গোপনে পুনর্বিবাহের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কাগজপত্র, বিবাহের তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রবাসজীবনে দীর্ঘ দূরত্ব ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা অনেক সময় দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করলেও তা কোনোভাবেই প্রতারণা বা গোপন বিয়ের বৈধতা দেয় না। তারা বলছেন, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের জায়গা থেকে এ ধরনের ঘটনা পরিবার ও সন্তানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এদিকে অভিযোগ দায়েরের পর বিষয়টি নিয়ে মৌলভীবাজার শহরে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি, যাতে সত্যতা উদঘাটনের পাশাপাশি ভুক্তভোগী পক্ষ ন্যায়বিচার পায়।

