প্রতিবেদক: জাগ্রত বার্তা প্রতিবেদক
আমেরিকা কেন সবসময় যুদ্ধে জড়ায়?
সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বশান্তি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। প্রতিটি যুদ্ধ শুরু হয় পরিচিত শব্দ দিয়ে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মুক্তি। কিন্তু ইতিহাসের পাতা নিরপেক্ষভাবে উল্টালে এক ভয়ংকর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়: মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে যুদ্ধ কোনো ব্যতিক্রম নয়—এটি একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। এটি কোনো আদর্শিক অভিযোগ নয়। এটি ইতিহাসের নথিভুক্ত সত্য। 🌍বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বৈশ্বিক ধারাবাহিকতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্
রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে শত শত সামরিক হস্তক্ষেপ চালিয়েছে খোলা আগ্রাসন, বিমান হামলা, প্রক্সি যুদ্ধ, অভ্যুত্থান, নিষেধাজ্ঞা ও গোপন অভিযানসহ। টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, ১৭৭৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৪০০টির মতো সামরিক হস্তক্ষেপে জড়িয়েছে, যার অধিকাংশই ঘটেছে ১৯৪৫ সালের পর। শীতল যুদ্ধের অবসানের পর এই প্রবণতা কমেনি বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে। জাপান ও কোরিয়া থেকে ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে লিবিয়া, ফিলিস্তিন থেকে ইরান ও ভেনিজুয়েলা— প্রায় প্রতিবারই পরিণতি এক: ধ্বংসপ্রাপ্ত রাষ্ট্র, বিভক্ত সমাজ এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ। “শক্তির মাধ্যমে শান্তি”—একটি ব্যর্থ ধারণা ওয়াশিংটন দাবি করে, যুদ্ধ শেষ উপায়। ইতিহাস বলে—তা সত্য নয়। ▪ ভিয়েতনাম যুদ্ধ: প্রায় ২০ লাখ বেসামরিক নাগরিক নিহত, প্রজন্মজুড়ে রাসায়নিক অস্ত্রের ক্ষত। ▪ ইরাক যুদ্ধ: একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও লাখো শরণার্থী। ▪ আফগানিস্তান যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধ, শেষ হয় রাষ্ট্রীয় পতনের মাধ্যমে। ▪ লিবিয়া অভিযান: মানবিকতার নামে হস্তক্ষেপ, ফলাফল—ব্যর্থ রাষ্ট্র ও দাসবাজার। এই পরিণতিগুলো অপ্রত্যাশিত ছিল না। বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক এমনকি সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারাও সতর্ক করেছিলেন—কিন্তু উপেক্ষা করা হয়েছে। গণতন্ত্র বন্দুকের নল দিয়ে আসে না, তবু সামরিক শক্তিই থেকে গেছে পছন্দের অস্ত্র। ☠️বেসামরিক মৃত্যু “পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া” নয়—এটাই মূল্য ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রকল্প অনুযায়ী ৯/১১ পরবর্তী যুদ্ধে প্রায় ১০ লাখ মানুষ সরাসরি নিহত এর মধ্যে ৪ লাখ ৩০ হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক পরোক্ষভাবে (দুর্ভিক্ষ, রোগ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস) নিহত আরও লক্ষাধিক বিশ্বজুড়ে ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত এই তথ্য কোনো শত্রু রাষ্ট্রের নয়— এসব এসেছে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে। তবু মূলধারার আলোচনায় এসব জীবন শুধু পরিসংখ্যান। অন্যদিকে বাড়ে প্রতিরক্ষা বাজেট, অস্ত্র ব্যবসায়ীদের রেকর্ড মুনাফা। যুদ্ধ যখন নীতি, ব্যর্থতা নয় প্রশ্ন একটাই—কেন এই ধারাবাহিকতা? কারণ যুদ্ধ কিছু স্বার্থকে সেবা দেয়: বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক-শিল্প জোটকে টিকিয়ে রাখে ভূরাজনৈতিক আধিপত্য নিশ্চিত করে সম্পদ, বাণিজ্যপথ ও প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করে ঘরোয়া বৈষম্য ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা আড়াল করে শান্তি মুনাফা আনে না। যুদ্ধ আনে। এই কারণেই কূটনীতি পেছনে পড়ে যায়, আন্তর্জাতিক আইন বেছে বেছে প্রয়োগ হয়, আর জবাবদিহিতা থাকে অনুপস্থিত। ফিলিস্তিন থেকে ভেনিজুয়েলা ফিলিস্তিনে মৃত্যু হলে বলা হয়— “আত্মরক্ষা” নিষেধাজ্ঞায় মানুষ অনাহারে মরলে বলা হয়— “চাপ সৃষ্টি” যে সরকার মার্কিন প্রভাব মানে না—সে “স্বৈরাচার” ইরান হোক বা ভেনিজুয়েলা— খোলা আগ্রাসনের বদলে অর্থনৈতিক যুদ্ধ, কিন্তু যন্ত্রণা একই, উদ্দেশ্যও। বদলায় শুধু ভাষা, বদলায় না পরিণতি। নীরবতাই আসল গল্প যুক্তরাষ্ট্র শান্তির কথা সবচেয়ে বেশি বলে, কিন্তু পরবর্তী যুদ্ধের প্রস্তুতিও নেয় সবচেয়ে বেশি অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ, যুদ্ধ প্রতিরোধ বা যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহিতায় নেতৃত্ব নয়— বরং নেতৃত্ব দেয় অস্ত্র বিক্রি, সামরিক জোট ও হস্তক্ষেপ কৌশলে। শান্তি উচ্চারিত হয়। যুদ্ধ চর্চিত হয়। সম্পাদকীয় মতামত | জাগ্রত বার্তা সাংবাদিকতার দায়িত্ব ক্ষমতাকে তোষামোদ করা নয়, বরং প্রশ্ন করা। ইতিহাস প্রমাণ করে—যখন যুদ্ধ স্বাভাবিক হয়ে যায়, সত্য প্রথমে মারা যায়, আর সবশেষে সাধারণ মানুষ। যে রাষ্ট্র মহাদেশজুড়ে গণকবর রেখে যায়, তার শান্তির ভাষণ দেওয়ার নৈতিক অধিকার নেই। নেতৃত্বের মাপকাঠি সামরিক শক্তি নয়— সংযম, জবাবদিহিতা ও মানবজীবনের প্রতি সম্মান বিশ্ব যদি সত্যিই শান্তি চায়, তবে যুদ্ধ থেকে লাভবানদের করতালি বন্ধ করতেই হবে— যত সুন্দর ভাষাতেই তারা গণতন্ত্রের কথা বলুক না কেন।

