মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
রাজাকারদের তালিকায় কেন নাম ছিল না আল্লামা ফুলতলীর?
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি স্বাধীনতার সংগ্রাম নয়, এটি জাতির আত্মত্যাগ, বিশ্বাসঘাতকতা, মানবতা ও নৈতিক অবস্থানের এক জটিল ইতিহাস। একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা সময়ে কারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন, কারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী ছিলেন তা নিয়ে আজও নানা আলোচনা, বিতর্ক ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বিদ্যমান। তবে ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষণে কিছু ব্যক্তিত্ব সময়ের পরীক্ষায় ভিন্নভাবে উঠে আসেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম, উস্তাদুল মুহাদ্দিসীন হযরত আল্লামা আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.) তাদেরই একজন।
দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন নানা মহলে ঘুরপাক খায় যদি তিনি পাকিস্তানপন্থী হতেন, তাহলে কেন তাঁর নাম রাজাকার, আলবদর বা শান্তি কমিটির তালিকায় পাওয়া যায় না? স্থানীয় ইতিহাস, প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণ, আঞ্চলিক দলিল ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণাগ্রন্থ ঘেঁটে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সীমান্তবর্তী জনপদে মানবিক আশ্রয়স্থল ১৯৭১ সালে সিলেটের জকিগঞ্জ, কানাইঘাট ও সংলগ্ন সীমান্ত অঞ্চল ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর তৎপরতার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। ভারত সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় এসব অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচল যেমন ছিল, তেমনি ছিল পাকবাহিনীর অভিযান, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতন। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আল্লামা ফুলতলী (রহ.) নিজেকে কোনো সশস্ত্র রাজনৈতিক বলয়ের অংশ না করে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় মনোযোগী হন বলে স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য। স্থানীয় ইতিহাস গবেষক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আঞ্চলিক সূত্রগুলোতে উল্লেখ রয়েছে, যুদ্ধের সময় বহু নিরীহ মানুষ বিশেষ করে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সীমান্ত অভিমুখে পালিয়ে যাচ্ছিল। সে সময় আল্লামা ফুলতলী (রহ.) নিজের প্রভাব ও সামাজিক অবস্থান ব্যবহার করে বহু পরিবারকে আশ্রয়, খাদ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ মুক্তিযুদ্ধ-স্মৃতিধারকের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কখনো নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতনকে সমর্থন করেননি; বরং শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। পাকিস্তানি বর্বরতার বিরোধিতা অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন আঞ্চলিক দলিল ও মৌখিক ইতিহাসে দাবি করা হয়েছে, আল্লামা ফুলতলী (রহ.) পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার হত্যা, গ্রামে আগুন দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়নের বিরোধিতা করেছিলেন। যদিও তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে অংশ নেননি, তবে তাঁর বক্তব্য ও অবস্থান ছিল মূলত সহিংসতা-বিরোধী এবং মানবিকতার পক্ষে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, তিনি এলাকায় রক্তপাত ও প্রতিশোধপরায়ণতা কমাতে প্রভাবশালী মহলে কথাও বলেছেন। তাহলে বিতর্কের সূত্র কোথায়? ইতিহাস বিশ্লেষকদের মতে, বিতর্কের প্রধান কারণ ছিল তৎকালীন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সাথে তাঁর অতীত সম্পৃক্ততা। পাকিস্তান আমলে অবিভক্ত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলামের রাজনীতির সাথে বিভিন্ন পর্যায়ে ধর্মীয় আলেমদের সম্পর্ক ছিল। সেই সূত্র ধরে পরবর্তী সময়ে কিছু রাজনৈতিক মহল আল্লামা ফুলতলী (রহ.)-কেও বিতর্কে টেনে আনার চেষ্টা করে। তবে অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে স্বাধীনতার পর যুদ্ধাপরাধ, রাজাকার বা শান্তি কমিটির যে তালিকা বিভিন্ন সময় প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে তাঁর নামের কোনো প্রামাণ্য উপস্থিতি পাওয়া যায় না। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক ও আঞ্চলিক ইতিহাসবিদদের অনেকেই বলছেন,যদি তিনি সরাসরি পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হতেন, তাহলে যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত কোনো মামলা, অভিযোগ বা রাষ্ট্রীয় তদন্ত থাকত। কেন নাম ওঠেনি রাজাকার তালিকায়? এ প্রশ্নের উত্তরে গবেষকরা কয়েকটি কারণ সামনে আনছেন প্রথমত, তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের কোনো দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে তিনি নিরীহ মানুষের রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। তৃতীয়ত, স্বাধীনতার পর তিনি কোনো বিতর্কিত রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ না করে সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় শিক্ষা, কুরআন চর্চা ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করেন।এছাড়া তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা ও দাওয়াহভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে কখনো নিষিদ্ধ বা প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কও ছিল স্বাভাবিক স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিত্বদের সাথে আল্লামা ফুলতলী (রহ.)-এর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বলেও একাধিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও কুরআন শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও প্রশংসিত হয়।বিশেষ করে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট দেশজুড়ে বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষার যে ধারা তৈরি করে, তা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও পরিচিতি লাভ করে। ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠ কী বলছে? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আবেগ, রাজনীতি ও মতাদর্শের সংঘাত থাকলেও নিরপেক্ষ গবেষকরা মনে করেন, কাউকে অভিযুক্ত করতে হলে সুনির্দিষ্ট দলিল, প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ও প্রমাণ প্রয়োজন। আল্লামা আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.)-এর ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত যে দলিল, আঞ্চলিক ইতিহাস, স্মৃতিচারণ ও গবেষণা পাওয়া যায়, তাতে তাঁকে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রত্যক্ষ দোসর বা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার মতো শক্ত প্রমাণ মেলেনি। বরং বিভিন্ন সূত্রে তাঁর মানবিক ভূমিকা, নিরীহ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার চেষ্টার কথাই বেশি উঠে এসেছে। ইতিহাসবিদদের ভাষায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাই একই ভূমিকায় ছিলেন না। কেউ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, কেউ আশ্রয় দিয়েছেন, কেউ মানুষ বাঁচিয়েছেন। ইতিহাসের মূল্যায়নে সব ভূমিকাকেই প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। দলিল ও তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (১৫ খণ্ড), সিলেটের যুদ্ধকালীন আঞ্চলিক ইতিহাস, আজিজুর রহমানের ‘সিলেটের যুদ্ধকথা’, জকিগঞ্জ অঞ্চলের মুক্তিসংগ্রামভিত্তিক গবেষণা, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণ, ‘আল্লামা ফুলতলী (রহ.): জীবন ও কর্ম’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশনা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক দলিলপত্র পর্যালোচনা।

