পটুয়াখালী প্রতিনিধি
ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারীর তালিকায় মাদক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি!
পটুয়াখালীর বাউফলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারীদের চূড়ান্ত তালিকায় মাদক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত এক ব্যক্তির নাম থাকায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একই তালিকায় রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ডের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির উপকারভোগীদের তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও আইনগত অ
বস্থান যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু বাউফলে প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে এরই মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম তালিকায় চূড়ান্ত তালিকায় উপজেলার বগা ইউনিয়নের সাবুপুরা গ্রামের কামাল হোসেনের ছেলে মো. মাসুম হাওলাদারের নাম রয়েছে। স্থানীয়ভাবে তিনি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি হিসেবে পরিচিত বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালে দায়ের করা একটি মাদক মামলায় পটুয়াখালীর আদালত মাসুম হাওলাদারকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। পরে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। তবে ওই সাজা বাতিলের জন্য করা আপিলের এখনো শুনানি হয়নি। ফলে নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রয়েছে বলে তার আইনজীবীও জানিয়েছেন। এ অবস্থায় একজন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি কীভাবে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারীদের চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেলেন এ নিয়েই মূল প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, বিষয়টি যাচাই করে তালিকায় কোনো ভুল বা অনিয়ম থাকলে তা সংশোধন করা হোক। আইনজীবীর বক্তব্যে সাজা বহালের বিষয়টি নিশ্চিত মাসুম হাওলাদারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে তার আইনজীবী মিলন হাওলাদার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, একটি মাদক মামলায় পটুয়াখালীর আদালত মাসুম হাওলাদারকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। পরে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। তবে সাজা বাতিলের জন্য করা আপিলের এখনো শুনানি হয়নি। ফলে নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রয়েছে। তালিকার দ্বিতীয় নাম নিয়েও প্রশ্ন শুধু মাসুম হাওলাদার নন, একই চূড়ান্ত তালিকায় দ্বিতীয় নম্বরে থাকা রত্না আক্তারের নাম নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, রত্না আক্তার আওয়ামী লীগপন্থি পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত। তবে রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অযোগ্য বলা যায় কি না, সে বিষয়ে কোনো নিরপেক্ষ যাচাইয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের প্রশ্ন তাহলে তাকে কোন মানদণ্ডে এবং কী প্রক্রিয়ায় তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে? তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যোগ্যতা, দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাই নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচ্য হওয়া উচিত। গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে বিতর্কিতদের দায়িত্ব নয়’ স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম আব্দুস সালাম বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগ্যতা, রাজনৈতিক পরিচয় ও আইনগত বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন। তালিকায় কোনো অনিয়ম থাকলে তদন্ত করে প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানান তিনি। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, যারা প্রকৃতভাবে যোগ্য ও সুবিধাবঞ্চিত, তাদের বাদ দিয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হলে সাধারণ মানুষ ফ্যামিলি কার্ডের সঠিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তাই তালিকাটি পুনরায় যাচাই করা দরকার। রুহুল আমিন নামের আরেক স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে তালিকা প্রণয়ন করা হয়ে থাকতে পারে। এতে প্রকৃত যোগ্য ও সুবিধাবঞ্চিতরা বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি দ্রুত তালিকাটি যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। প্রমাণ দাখিল করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ অভিযোগের বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী নির্বাচন কমিটির সভাপতি সালেহ আহমেদ বলেন, ‘আমরা মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দিয়েছি। এর মধ্যে কে ভালো মানুষ আর কে সাজাপ্রাপ্ত, তা জানার সুযোগ ছিল না। কেউ সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ দাখিল করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ইউএনওর বক্তব্যের পর এখন প্রশ্ন উঠছে, চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়নের আগে প্রার্থীদের আইনগত অবস্থান যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা ছিল কি না। বিশেষ করে কোনো প্রার্থী আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত কি নাএমন তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছিল কি না, সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। তালিকা পুনঃযাচাইয়ের দাবি ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করে তাদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। এই প্রক্রিয়ার শুরুতেই তথ্য সংগ্রহকারীদের নিরপেক্ষতা, যোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, তালিকায় একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম থাকার বিষয়টি সত্য হলে সেটি প্রশাসনিকভাবে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক পরিচয় থাকলেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্তেও না গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগের নির্ধারিত মানদণ্ড কী ছিল, তা প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। সব মিলিয়ে বাউফলের ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারীদের চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে, তার অবসান ঘটাতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পুনঃযাচাইয়ের দাবি জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম তালিকায় থাকার বিষয়টি সত্য হলে কীভাবে তিনি নির্বাচিত হলেন তারও প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এখন প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা। প্রশ্ন এখন একটাই ফ্যামিলি কার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহে দায়িত্বপ্রাপ্তদের তালিকা চূড়ান্ত করার আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই কি হয়েছিল?

