মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে ঝকঝকে মৌলভীবাজার, কিন্তু কুসুমবাগ-চৌমুহনা সড়কের দুর্ভোগ কি শেষ হবে?
মৌলভীবাজার জেলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে সর্বত্র এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড়, সরকারি স্থাপনা, জনসমাগমস্থল ও প্রবেশপথগুলোকে নতুন রূপে সাজিয়ে তুলতে দিনরাত কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কোথাও রাস্তা মেরামত, কোথাও রং-তুলির আঁচড়, কোথাও পরিচ্ছন্নতা অভিযান সব মিলিয়ে যেন নতুন সাজে সেজে উঠছে পুরো মৌলভীবাজার। নগরবাসীর অনেকেই এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, শহরকে পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন করার যে কার্যক্রম চলছে, তা অবশ্যই প্রশংসার দ
াবি রাখে। দীর্ঘদিন পর প্রশাসনের এমন তৎপরতা সাধারণ মানুষের মাঝেও আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই আনন্দ ও প্রস্তুতির মধ্যেই একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরে ফিরে আসছে মানুষের মুখে মুখে এই উন্নয়ন ও সংস্কার কি কেবল বিশেষ সফরকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগ লাঘবেও বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হবে? এই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কুসুমবাগ পয়েন্ট থেকে চৌমুহনা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বহু বছর ধরে সড়কটির বিভিন্ন অংশ বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। খানাখন্দ, ভাঙাচোরা অংশ, জলাবদ্ধতা এবং অপরিকল্পিত সংস্কারের কারণে প্রতিদিনই চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে পথচারী, যানবাহনের চালক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ হাজারো মানুষকে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কের বিভিন্ন অংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও এত বেশি পানি জমে যে রাস্তা আর ড্রেনের পার্থক্য বোঝার উপায় থাকে না। ক্রেতারা দোকানে আসতে অনীহা প্রকাশ করেন, পরিবহন চলাচল ব্যাহত হয়, এমনকি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একজন ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা বছরের পর বছর ধরে এই রাস্তার দুর্ভোগ সহ্য করছি। বৃষ্টি হলে দোকানের সামনে হাঁটা যায় না, শুকনো মৌসুমে ধুলাবালিতে পরিবেশ অসহনীয় হয়ে ওঠে। অথচ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এখন শহরের বিভিন্ন জায়গা সাজানো হচ্ছে, কিন্তু আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির দিকে কবে নজর দেওয়া হবে? একই ধরনের প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। তাদের মতে, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয় যখন তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। শুধুমাত্র ভিআইপি চলাচলের সম্ভাব্য রুট বা দৃশ্যমান স্থানগুলো সংস্কার করলেই উন্নয়নের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে না। বরং যেসব সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চলাচল করেন, সেসব জায়গার দুর্ভোগ দূর করাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, যদি প্রধানমন্ত্রী এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত না-ও করেন, তাহলে কি এ রাস্তার গুরুত্ব কমে যায়? সাধারণ মানুষের কষ্ট কি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ নয়? একটি রাস্তা কি শুধু তখনই সংস্কারের যোগ্য হয়, যখন সেখানে কোনো ভিআইপি আসেন? এমন প্রশ্নগুলো নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও ভোগান্তির প্রতিচ্ছবি। কারণ কুসুমবাগ-চৌমুহনা সড়কটি কেবল একটি স্থানীয় রাস্তা নয়, এটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে এই সড়ক ব্যবহার করেন। অথচ বছরের পর বছর ধরে এর স্থায়ী সংস্কারের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। বিশ্লেষকদের মতে, একটি জেলার উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত অবকাঠামো, নাগরিক সুবিধা এবং জনদুর্ভোগ নিরসনের মাধ্যমে। উন্নয়ন মানে শুধু নতুন প্রকল্পের ঘোষণা নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের প্রতিদিনের কষ্ট কমানো, নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং নাগরিক সেবার মান উন্নত করা। তাই প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে যে পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবর্ধন ও সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, সেটি যদি দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত উন্নয়নের অংশে পরিণত হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন সাধারণ মানুষ। কুসুমবাগ পয়েন্ট থেকে চৌমুহনা পর্যন্ত সড়কটির দ্রুত সংস্কারও হতে পারে সেই জনমুখী উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে। তারা চান না উন্নয়নের আলো কেবল বিশেষ সফরের সময়ই দৃশ্যমান হোক; বরং বছরের পর বছর ধরে যে জনদুর্ভোগ জমে আছে, তারও স্থায়ী সমাধান হোক। কারণ একটি শহরের সৌন্দর্য শুধু রঙিন ব্যানার, আলোকসজ্জা কিংবা পরিচ্ছন্ন সড়কে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। আর উন্নয়নের প্রকৃত সফলতা তখনই অর্জিত হয়, যখন তা কেবল অতিথির চোখে নয় সাধারণ মানুষের জীবনেও স্বস্তি, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বয়ে আনে।

