মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
মৌলভীবাজারে জাল পে-অর্ডার কেলেঙ্কারি
মৌলভীবাজারে সরকারি বালুমহাল ইজারা কার্যক্রমকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির অভিযোগে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান “মেসার্স রহমান এন্টারপ্রাইজ” এবং এর স্বত্বাধিকারী মোঃ আব্দুর রহমানকে পাঁচ বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করেছে জেলা প্রশাসন। ব্যাংকের নাম ব্যবহার করে জাল ও নকল পে-অর্ডার দাখিলের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রশাসনের এ কঠোর সিদ্ধান্তকে স্থানীয় প্রশাসনিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৪৩৩ বাংলা সনের সাধারণ বালুমহাল ইজারা কার্যক্রমের প্রথম পর্যায়ে মৌলভ
ীবাজার সদর উপজেলার “মনুনদী আংশিক-১৯” এবং “মনুনদী আংশিক-১২” বালুমহালের দরপত্রে অংশ নেয় “মেসার্স রহমান এন্টারপ্রাইজ”। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মোঃ আব্দুর রহমান, যিনি প্রথম শ্রেণির তালিকাভুক্ত ঠিকাদার হিসেবে নিবন্ধিত (সনদ নম্বর-০৬/২০১৭ইং), দরপত্রের জামানত হিসেবে এনআরবিসি ব্যাংক, মৌলভীবাজার শাখার নামে দুটি পে-অর্ডার জমা দেন। জমাকৃত পে-অর্ডার দুটির একটি ছিল ১৩ লাখ ১০ হাজার টাকার এবং অন্যটি ৮ লাখ ১০ হাজার টাকার। পে-অর্ডার নম্বর যথাক্রমে ৬৭৭৪৪৭৭ ও ৬৭৭৪৪৭৬, যার তারিখ উল্লেখ করা হয় ২৯ মার্চ ২০২৬। তবে পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে, এসব পে-অর্ডার প্রকৃত নয়; বরং সেগুলো জাল ও নকলভাবে তৈরি করে জমা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়। গত ৬ এপ্রিল ২০২৬ অনুষ্ঠিত জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বত্বাধিকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ মে মৌলভীবাজারের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (রুটিন দায়িত্ব) মোঃ জাহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক আদেশে “মেসার্স রহমান এন্টারপ্রাইজ”-কে পাঁচ বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত ঘোষণা করা হয়। একইসঙ্গে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত-২০২৩) এবং বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি বিভিন্ন টেন্ডার ও ইজারা কার্যক্রমে জাল পে-অর্ডার, ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি এবং নথি জালিয়াতির মতো ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। কিছু অসাধু ও সুযোগসন্ধানী ঠিকাদার সরকারি প্রকল্প হাতিয়ে নিতে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন। এতে শুধু সরকারি অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে না, বরং প্রকৃত ও সৎ ঠিকাদাররাও প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, জাল পে-অর্ডারের মতো অপরাধ শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, এটি সরাসরি আর্থিক প্রতারণার শামিল। এ ধরনের ঘটনা যদি দ্রুত দমন করা না যায়, তবে সরকারি দরপত্র ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দরপত্র জমাদানের সময় ব্যাংকিং যাচাই প্রক্রিয়া আরও আধুনিক ও ডিজিটাল করা জরুরি, যাতে ভুয়া নথি সহজেই শনাক্ত করা যায়। এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একটি চক্র প্রভাব খাটিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে। প্রশাসনের কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে এমন জালিয়াতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশা করছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে—শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে? কারণ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে অতীতেও জাল পে-অর্ডার ব্যবহার করে কাজ নেওয়ার অভিযোগ উঠলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা ধামাচাপা পড়ে গেছে। মৌলভীবাজারের সাম্প্রতিক এই ঘটনা তাই কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; বরং সরকারি দরপত্র ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

