মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
সাবেক মহিলা এমপি.অসুস্থ খালেদা রাব্বানীর খোঁজ নিতে বাসায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
রাজনীতি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের গল্প নয়। রাজনীতির ভেতরে থাকে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, সহযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান, দীর্ঘদিনের সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ত্যাগী কর্মীদের অবদানের স্বীকৃতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক রাজনৈতিক ঘটনা ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়, কিন্তু কিছু মুহূর্ত মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয় মানবিকতার কারণে। মৌলভীবাজারে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফরে তেমনই একটি আবেগঘন মুহূর্তের জন্ম হয়েছে। মৌলভীবাজারে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন, চা শ্রমিকদে
র জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক উদ্যোগ ঘোষণা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে তিনি শহরের শাহ মোস্তফা রোডস্থ বাসভবনে গিয়ে খোঁজ নেন প্রবীণ বিএনপি নেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য বেগম খালেদা রাব্বানীর। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ এই প্রবীণ নেত্রীর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন তিনি, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। একটি ব্যস্ত রাজনৈতিক সফরের শেষ প্রান্তে এমন একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ অনেকের কাছেই ছিল কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু যারা খালেদা রাব্বানীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম এবং অবদান সম্পর্কে জানেন, তাদের কাছে এই সাক্ষাৎ ছিল এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কারণ এটি ছিল একজন প্রবীণ সহযোদ্ধার প্রতি সম্মান প্রদর্শন, একটি রাজনৈতিক ইতিহাসকে স্মরণ করা এবং মানবিক রাজনীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সামাজিক আন্দোলনের ভেতর দিয়ে রাজনীতিতে আগমন খালেদা রাব্বানীর নাম আজ মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু তাঁর পথচলার শুরুটা ছিল ভিন্ন। তিনি প্রথমে কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত হননি। বরং সমাজসেবা এবং নারী সমাজকে সংগঠিত করার মধ্য দিয়েই তিনি মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেন। সত্তরের দশকের শেষ দিকে মৌলভীবাজার ছিল রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং সাংস্কৃতিকভাবে সক্রিয় একটি জনপদ। সে সময় নারী অধিকার, সামাজিক বৈষম্য এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগঠিত কোনো শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম ছিল না। এমন এক প্রেক্ষাপটে নারী নির্যাতনের একটি ঘটনা স্থানীয় সচেতন মহলকে নাড়া দেয়। প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী ও ছাত্রনেতারা তখন নারীদের নিয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার চিন্তা করেন। কিন্তু তারা বুঝতে পারেন, আন্দোলনের নেতৃত্ব এমন একজন নারীর হাতে দিতে হবে যিনি সমাজে গ্রহণযোগ্য, সম্মানিত এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে। সেই আলোচনায় উঠে আসে খালেদা রাব্বানীর নাম। তিনি তখন মহিলা সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নারী সমাজের কাছে পরিচিত মুখ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর সম্মতিতে গঠিত হয় ‘মৌলভীবাজার নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি’। তিনি হন এর আহ্বায়ক। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল অত্যন্ত সাহসী এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ। যখন জাতীয় পর্যায়ে নারী অধিকার আন্দোলন সংগঠিত রূপ পায়নি, তখন মৌলভীবাজারে এমন একটি উদ্যোগ সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সামাজিক কর্মী থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নেত্রী সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করার পর ধীরে ধীরে তাঁর জীবনে রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৌলভীবাজার সফরের সময় দেশের রাজনীতিতে নতুন এক ধারার উত্থান ঘটছিল। জাগদল গঠনের মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি নির্মিত হচ্ছিল। মৌলভীবাজারেও সেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব পড়ে। অ্যাডভোকেট সৈয়দ আব্দুল মতিন, মঈন উল ইসলাম, আবদুল খালিকসহ অনেকেই জাগদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। খালেদা রাব্বানীও সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে জাগদল বিএনপিতে রূপান্তরিত হলে তিনিও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন শুরু করেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, সততা এবং গ্রহণযোগ্যতার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বিএনপি তাঁকে মহিলা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর রাজনৈতিক পরিসর বিস্তৃত হতে থাকে। জাতীয় রাজনীতিতে উজ্জ্বল উপস্থিতি খালেদা রাব্বানী শুধু জেলা পর্যায়ের নেত্রী হয়ে থাকেননি। তিনি জাতীয় পর্যায়েও নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন। একাধিকবার সংরক্ষিত নারী আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং সংসদে নারীর অধিকার, সামাজিক উন্নয়ন এবং জনকল্যাণমূলক বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আস্থাভাজন নেত্রীদের একজন। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেন। দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন বিদেশ সফরে খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এটি শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয় ছিল না; বরং তাঁর প্রতি দলের আস্থা ও সম্মানের প্রতিফলন ছিল। মৌলভীবাজারের মানুষের কাছে এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গর কাছে খালেদা রাব্বানী সম্মানের এক নাম। রাজনীতিতে সফলতার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হচ্ছে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। সেই দিক থেকে খালেদা রাব্বানী ছিলেন ব্যতিক্রমী একজন নেত্রী। মৌলভীবাজারের মানুষ তাঁকে শুধু একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখেননি। তিনি ছিলেন এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে তিনি মানুষের কাছে ‘খালেদা আপা’ হিসেবে পরিচিতি পান। বিশেষ করে নারীদের সংগঠিত করা, তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা এবং সমাজে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। আজও মৌলভীবাজারের অনেক নারী তাঁর নাম উচ্চারণ করেন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। অসুস্থতা, নিভৃত জীবন এবং স্মৃতির ভাণ্ডার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর এখন তিনি বার্ধক্য ও অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে রয়েছেন। স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি বাসায় চিকিৎসাধীন। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ কিংবা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁকে আর দেখা যায় না। তবে তাঁর স্মৃতি, অবদান এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের গল্প এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এক সময় যিনি হাজার মানুষের সমাবেশে বক্তব্য দিতেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির নেতৃত্ব দিতেন, আজ তিনি শয্যাশায়ী। সময়ের এই নির্মম বাস্তবতা অনেককেই আবেগাপ্লুত করে। তারেক রহমানের সফর: রাজনৈতিক সৌজন্যের বাইরে এক মানবিক বার্তা এমন এক সময়ে তাঁর বাসভবনে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তারেক রহমান শুধু একজন অসুস্থ নেত্রীর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেননি; তিনি যেন সম্মান জানিয়েছেন একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসকে, একটি সংগ্রামী জীবনকে এবং একজন প্রবীণ সহযোদ্ধার অবদানকে। সাক্ষাৎকালে তিনি খালেদা রাব্বানীর রাজনৈতিক জীবন, দলের জন্য তাঁর ত্যাগ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁর চিকিৎসার বিষয়ে খোঁজ নেন এবং দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। উপস্থিত অনেকেই মনে করেন, এই সফর রাজনৈতিক সৌজন্যের চেয়েও বেশি কিছু। এটি ছিল কৃতজ্ঞতার প্রকাশ, স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন। ইতিহাসে থেকে যাবে একটি নাম একজন অবরোধবাসিনী নারী থেকে সামাজিক আন্দোলনের নেত্রী, সেখান থেকে জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ খালেদা রাব্বানীর জীবন এক অনন্য অনুপ্রেরণার গল্প। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আন্দোলনের আহ্বায়ক হিসেবে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা তাঁকে জাতীয় সংসদ, দলীয় নেতৃত্ব এবং মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান এনে দিয়েছে। মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক ইতিহাস রচিত হলে খালেদা রাব্বানীর নাম উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। আর তাঁর অসুস্থতার সময়ে খোঁজ নিতে গিয়ে তারেক রহমান যেন নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিলেন রাজনীতির প্রকৃত শক্তি ক্ষমতায় নয়, মানুষের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসায়। সময়ের স্রোতে পদ-পদবি বদলে যায়, ক্ষমতার পালাবদল ঘটে; কিন্তু মানুষের জন্য কাজ করা, সহযোদ্ধাদের সম্মান করা এবং মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া মানুষদেরই ইতিহাস দীর্ঘদিন মনে রাখে। খালেদা রাব্বানীর জীবন এবং তাঁকে ঘিরে এই সাম্প্রতিক আবেগঘন মুহূর্ত সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

