মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
ভোগান্তির প্রতিচ্ছবি মৌলভীবাজার পাসপোর্ট অফিস: সেবা নিতে গিয়ে অপমান, হয়রানি আর দুর্ভোগে নাকাল প্রবাসী ও সাধারণ মানুষ!
মৌলভীবাজার, ১৬ জুন ২০২৬ নাগরিকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেবাপ্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও মৌলভীবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস যেন দিন দিন পরিণত হচ্ছে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কেন্দ্রে। প্রতিদিন শত শত মানুষ নতুন পাসপোর্ট কিংবা নবায়নের আশায় অফিসে এলেও তাদের অনেকেই ফিরছেন চরম দুর্ভোগ, হতাশা এবং ক্ষোভ নিয়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, তথ্যের জন্য হয়রানি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসহযোগিতা এবং দালালচক্রের প্রভাব—সব মিলিয়ে অফিসটির সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগীরা। বিশেষ করে প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা হিস
েবে মৌলভীবাজারে পাসপোর্ট সেবার গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত এই অফিসে আসেন জরুরি প্রয়োজনে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের অযথা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়ার পরিবর্তে তাদের সময়, অর্থ এবং মানসিক শান্তি সবকিছুরই ক্ষতি হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ। তাদের দাবি, তথ্য জানতে চাইলে বা কোনো সমস্যার সমাধান চাইলে অনেক সময় সহযোগিতা পাওয়ার বদলে ধমক, অবজ্ঞা কিংবা কটূক্তির মুখোমুখি হতে হয়। একজন সরকারি কর্মচারীর কাছ থেকে যে ধরনের পেশাদার ও মানবিক আচরণ প্রত্যাশিত, বাস্তবে তার উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক সেবাগ্রহীতা। সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন এই প্রতিবেদকের একজন প্রতিনিধি। পাসপোর্টের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ছবি তোলার পর স্বাক্ষর প্রদানের সময় সামান্য জটিলতার মুখে পড়েন এক সাধারণ সেবাগ্রহীতা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি ধৈর্যের সঙ্গে সমাধান করার পরিবর্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মচারী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান এবং উপস্থিত সবার সামনে ওই ব্যক্তিকে অপমানজনক মন্তব্য করেন। ঘটনাটি উপস্থিত মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে নাগরিক মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত—সেই প্রশ্ন আবারও সামনে নিয়ে আসে। সরেজমিনে দেখা গেছে, তীব্র গরম উপেক্ষা করে অফিসের ভেতর ও বাইরে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ ও শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। অনেকেই সকাল থেকে অপেক্ষা করেও দিনের শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত কাজ সম্পন্ন করতে পারেননি। পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, কার্যকর তথ্যসেবা কিংবা সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে অফিসটিকে ঘিরে দালালচক্রের সক্রিয় উপস্থিতির অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কিছু অসাধু ব্যক্তি অফিসের আশপাশে ঘোরাফেরা করে দ্রুত কাজের আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। অনেকের অভিযোগ, অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না করলে কিংবা প্রভাবশালী কারও সুপারিশ না থাকলে ফাইলের গতি মন্থর হয়ে যায়। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও তদন্তের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের, তবুও অভিযোগের পুনরাবৃত্তি সাধারণ মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিদেশে থেকে আমরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছি। অথচ দেশে ফিরে একটি পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে যদি হয়রানি ও অপমানের শিকার হতে হয়, তাহলে সেটি অত্যন্ত হতাশাজনক ও দুঃখজনক।” সচেতন নাগরিকদের মতে, পাসপোর্ট অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সেবার মান উন্নয়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তারা মনে করেন, অফিসের সার্বিক কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং অসদাচরণে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে দালালচক্রের প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারের বিভিন্ন সেবাখাতে ডিজিটাল রূপান্তর ও নাগরিকবান্ধব উদ্যোগের কথা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যদি সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সম্মান ও সেবা না পান, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছায় না। মৌলভীবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই একটি উদ্বেগজনক উদাহরণ। সেবাগ্রহীতাদের প্রত্যাশা একটাই—পাসপোর্ট অফিস যেন হয় নাগরিক সেবার নির্ভরযোগ্য ঠিকানা, ভোগান্তির প্রতীক নয়। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে অনিয়ম, দুর্ব্যবহার ও হয়রানির অভিযোগ দূর করে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ এবং জনবান্ধব সেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করা হোক এমন দাবিই এখন জেলার সাধারণ মানুষের।

