আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কোন পথে — দলে বিভাজন, নেতৃত্বে অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। সরকার জানিয়ে দিয়েছে, দলটি আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। শীর্ষ নেতাদের অনেকে বিদেশে পলাতক, অনেকে কারাগারে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও দলটির প্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে। এই জটিল বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কো
ন পথে—এটাই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো অনমনীয় পলাতক বা আত্মগোপনে থাকা বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা জানাচ্ছেন, তাঁদের মূল লক্ষ্য—আগামী নির্বাচনকে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে হতে না দেওয়া। অনেক নেতা বিশ্বাস করেন, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপের মুখে ফেলতে পারলেই নির্বাচন প্রক্রিয়া থামানো সম্ভব। তবে এই কৌশল ব্যর্থ হলে পরবর্তী করণীয় কী—তা নিয়ে নেতৃত্বের ভেতর কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। দলে ‘পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ’ ভাবনা দলের ভেতরে এবং বিদেশি শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে আলোচনার মূল বিষয়—ভুল স্বীকার করে দলকে পুনর্গঠনের প্রয়োজন। কিন্তু শেখ হাসিনা ও কেন্দ্রীয় নেতারা এখনো অতীতের ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইতে রাজি নন। দোষ স্বীকার করা মানে ‘ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে অপরাধ স্বীকার’—এমন যুক্তিতে অনড় তাঁরা। রায়ে নতুন সংকট: নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের সঙ্গে সঙ্গেই আলোচনায় এসেছে দলের সম্ভাব্য নেতৃত্ব পরিবর্তন। কেউ কেউ বলছেন, একসময় শেখ হাসিনা হয়তো পরিবারের অন্য সদস্যের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিতে পারেন; তবে আপাতত বিতর্কিত নেতাদের দিয়েই সময় কাটাতে চান তিনি। ফিরে আসার দুই পথ—দুটিই কঠিন বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের হাতে এখন দুটি পথ— আরেকটি গণ-অভ্যুত্থান ঘটানো (যা দলেই অনেকে অসম্ভব বলে মনে করেন) ভুল স্বীকার করে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া ও সংগঠন পুনর্গঠন (যার কোনো লক্ষণ এখনো নেই) দলের মধ্যে পলাতক নেতাদের দ্বন্দ্ব, তৃণমূলের অর্থ সংকট, এবং সংগঠনের ভাঙন—সবমিলিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোকে অনেকে অসাধ্য বলে মনে করছেন। সহানুভূতি পাওয়ার সুযোগ কম জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টে গণ-অভ্যুত্থানে ১,৪০০ নিহত ও ৩০,০০০ আহত—এই বিশাল ক্ষতির কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি জনসমর্থন ফিরে আসা কঠিন বলেই বিশ্লেষকদের মত। বিএনপি–জামায়াতও দীর্ঘদিনের নির্যাতনের স্মৃতি ভুলে যাবে না। ভারত ও বিদেশি শক্তির ওপর ভরসা শেখ হাসিনা ভারত পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে দলটির উচ্চপর্যায়ের অনেক নেতা সেখানেই অবস্থান করছেন। ভারত সরকারের সদয় আচরণ পেয়ে তাঁরা ভাবছিলেন—ভারত হয়তো ক্ষমতায় ফেরা সহজ করবে। ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরায়ও নতুন আশা জেগেছিল অনেকের মনে। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আশার বাস্তবতা ক্ষীণ হয়ে আসছে। নির্বাচনের পরের সরকারের ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান মনে করেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর যে সরকার ক্ষমতায় আসবে—তাদের আচরণই ঠিক করে দেবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অবস্থান। পরিস্থিতি তাই এখন ‘অপেক্ষা’—এ ছাড়া তাদের হাতে আপাতত কার্যকর বিকল্প নেই। শেষ কথা আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে কি না—তা নির্ভর করছে দলটির স্বীকারোক্তি, নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং সংগঠনগত পুনর্গঠনের ওপর। কিন্তু বর্তমান নেতৃত্ব এখনো অস্বীকার, অস্বীকৃতি ও প্রতিরোধের নীতি ধরে রেখেছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একসময়কার প্রভাবশালী দলটির ভবিষ্যৎ এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার মুখে।
