রাজনগর উপজেলা পরিষদের টাকা আত্মসাৎ কেলেঙ্কারি: তদন্তে বেরিয়ে আসছে রাঘব বোয়ালদের নাম
ফেরত এসেছে ১ কোটি ২২ লাখ টাকা মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলা পরিষদের উন্নয়ন তহবিল থেকে দেড় কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ, চেক জালিয়াতি ও নথিগত অসঙ্গতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। চার মাসে একাই ১ কোটি ৫১ লাখ ৫১ হাজার ৪৫৫ টাকা আত্মসাৎ করেছেন রাজনগর উপজেলা পরিষদের সাবেক সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর অনুপ দাস—এমনই অভিযোগ পাওয়া গেছে প্রাথমি
ক তদন্তে। পরিদর্শনে ধরা পড়ে কেলেঙ্কারি গত ২৮ অক্টোবর রাজনগর উপজেলা পরিষদ পরিদর্শনে গিয়ে মৌলভীবাজারের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন ক্যাশবই, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ধরতে পারেন। সাথে সাথেই তিনি বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মোসা. শাহিনা আক্তারকে। তিন তহবিল থেকে কোটি টাকার বেহাত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উঠে এসেছে তিনটি তহবিল থেকে টাকা বেহাতের প্রমাণ— হাট-বাজার সাধারণ তহবিল (অ্যাকাউন্ট: ৩৮০৪০২১০০০২০৭): ৮০,৫১,৪৫৫ টাকা রাজস্ব তহবিল (অ্যাকাউন্ট: ৫৮১৫৬৩৪০৩৭০৯৩): প্রায় ৪০ লাখ টাকা উন্নয়ন তহবিল (অ্যাকাউন্ট: ৫৮১৫৬৩৪০৮৫২৫৮): ৩১ লাখ টাকা মোট পরিমাণ দাঁড়ায় — ১,৫১,৫১,৪৫৫ টাকা। এসব টাকা বিভিন্ন ব্যাংকের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয় জাল চেক ও প্রতারণার মাধ্যমে। চেক জালিয়াতির বিস্তৃত চিত্র তদন্তে দেখা যায়— টেংরাবাজার পশুর হাটের জামানত হিসেবে দেখানো ৫ লাখ টাকা ব্যাংকে জমাই হয়নি। বরং উত্তোলন করা হয়েছে মতিন মিয়া নামের ব্যক্তির নামে। আয়কর ও ভ্যাট বাবদ ইস্যুকৃত কয়েকটি চেকের ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থ পরিশোধ না করে লাখ লাখ টাকা ট্রান্সফার করা হয়েছে অনুপ দাস, লিমন আহমদ, নিহার রঞ্জন দাসসহ আরও কয়েকজনের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে। ৫,৪২৭ টাকা আয়কর বাবদ ইস্যুকৃত চেক ব্যবহার করে উত্তোলন করা হয়েছে ৮,০৫,৪২৭ টাকা। ১৫,০৩২ টাকা ভ্যাট বাবদ ইস্যুকৃত চেক ব্যবহার করে উত্তোলন করা হয়েছে ৫,১৫,০৩২ টাকা। ইজারামূল্যের ওপর ১০% ও ১৫% ভ্যাট-আয়করের নামে ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি এক টাকাও। চার মাসেই আড়াই বছরের বেতন সমমান নয়—বরং কোটি টাকা! ২০০৯ সালে রাজনগরে যোগদান করা অনুপ দাস ২০২৪ সালের শুরু থেকে চেক জালিয়াতি করে টাকা তুলে আসছিলেন বলে তদন্তে প্রমাণ মিলেছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর বড়লেখায় বদলি করা হলেও বদলির আগেই তিনি কোটি টাকার অনিয়ম করে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বড়লেখায় কর্মরত অনুপ দাসের মোবাইলে একাধিকবার কল দিলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পালিয়ে থাকার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিবারের দাবি—ফেরত দিয়েছেন ১ কোটি ২২ লাখ অনুপ দাসের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার পর তারা ১ কোটি ২২ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন, যার মধ্যে ২২ লাখ টাকা পাওনার রশিদ দিয়েছেন বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। বড়লেখা ইউএনও গালিব চৌধুরী বলেন— “তার স্ত্রী কিছু টাকা ফেরত দিয়েছেন। তার আগেও আমাদের উপজেলায় একটি ঘটনার পরেও তাকে কন্টাক করা যাচ্ছিল না।” সাবেক ইউএনও-র বিস্ফোরক বক্তব্য রাজনগরের সাবেক ইউএনও আফরোজা হাবিব শাপলা বলেন— “আগের ইউএনও-র সময় থেকেই অনুপ দাস চেক জালিয়াতি করে আসছিল। স্বাক্ষরের পাশে ফাঁকা জায়গা রেখে পরে অঙ্ক বাড়িয়ে টাকা তুলেছে।” তিনি আরও জানান, ২০২৪ সাল থেকে তার প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া গেছে। জেলা প্রশাসকের বক্তব্য—দুদক মামলা হচ্ছে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন— “কিছু টাকা ফেরত এসেছে শুনেছি। অনুপ দাসের বিরুদ্ধে দুদকে মামলা হবে, বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেয়া হবে।” কে এই অনুপ দাস? রাজনগরের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এই কেলেঙ্কারি কি একা অনুপ দাসের পক্ষে সম্ভব? না কি আরও রাঘব বোয়াল আছে এর পেছনে? প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, তদন্ত এগোলে কারা এই দুর্নীতির ছায়া- তা পরিচালনা করছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। উপসংহার রাজনগরের কোটি টাকার এই আত্মসাৎ কাণ্ড প্রশাসনের দুর্বলতা, নজরদারির অভাব ও নথিপত্রের নিরাপত্তাহীনতার নগ্ন উদাহরণ। তদন্ত এখনো চলমান। স্থানীয়দের দাবি— “ সত্যিকারের দায়ীদের বিচার হোক, আর সরকারি টাকা যেন ফেরত আসে জনগণের উন্নয়নেই।”
