প্রতিবেদক: তারফদার মামুন
পৌষসংক্রান্তির সুরে শেরপুরের মাছের মেলা: ঐতিহ্যে উৎসবমুখর মৌলভীবাজার
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: পৌষসংক্রান্তি এলেই মৌলভীবাজারের মানুষের মনে ভেসে ওঠে এক পরিচিত উৎসবমুখর দৃশ্য—কুশিয়ারা নদীর তীরে বসা শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। শতবর্ষী এই আয়োজন এখন আর শুধু মাছ কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি জেলার মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বছরের অন্য সময় যেখানে নিয়মিত হাটবাজার চলে, সেখানে শেরপুরের এই মাছের মেলা বসে মাত্র একবার—পৌষসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে। আর এই একদিনকে ঘিরেই যেন জমে থাকে পুরো বছরের অপেক্ষা ও গল্প। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নে
র শেরপুর এলাকায় প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো এই মেলাটি প্রতিবছরই হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবের রূপ নেয়। এবছরও ব্যতিক্রম নয়—মেলায় উঠেছে বড় বড় কাতল, রুই, বোয়াল, আইড়, চিতলসহ নানা জাতের বাহারি মাছ। শতাধিক কেজি ওজনের মাছ দেখে বিস্মিত হচ্ছেন দর্শনার্থীরা, উৎসাহ নিয়ে ছবি তুলছেন অনেকেই। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিকেল থেকেই শেরপুরজুড়ে মেলার আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার আয়োজন শুরু হচ্ছে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি)। তবে সংক্রান্তির মূলদিন বুধবার (১৪ জানুয়ারি) মেলা পুরোপুরি জমে উঠবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ী ও আয়োজকেরা। এবারের মেলা বসেছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে এবং মৌলভীবাজার-শেরপুর আঞ্চলিক সড়কের পশ্চিমের মাঠে, বেরি বিল-সংলগ্ন এলাকায়। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের হাওর-বাঁওড় ও নদ-নদীর মাছের জন্য এই মেলার আলাদা কদর রয়েছে। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের হাকালুকি, কাউয়াদিঘি, হাইল হাওরসহ কুশিয়ারা নদীর মাছই এখানে প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। ক্রেতারা বলছেন, বাজারে চাষের মাছ সহজলভ্য হলেও শেরপুরের মেলায় মূলত মুক্ত জলাশয়ের মাছই বেশি জনপ্রিয়। তবে এ বছর স্থানীয় মাছের জোগান তুলনামূলক কম থাকায় দাম কিছুটা বাড়তি। তবুও ঐতিহ্যের টানে মানুষ ভিড় করছেন—দেখতে, কিনতে এবং উৎসবের স্বাদ নিতে। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে এই মাছের মেলা চালু করেছিলেন জমিদার মথুর বাবু। প্রথমদিকে মেলাটি সদর উপজেলার মনুমুখ এলাকায় বসত। পরে সেটি স্থানান্তর হয় শেরপুরে, কুশিয়ারা নদীর তীরে। স্থান বদলালেও মেলার আবেদন ও ঐতিহ্য আজও অটুট রয়েছে। মৎস্যজীবীদের জন্য এই মেলা বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। তারা জানান, বড় মাছ বিক্রির জন্য ৫ থেকে ৬ মাস আগেই প্রস্তুতি শুরু করেন। বিভিন্ন হাওর ও নদী থেকে সংগ্রহ করা মাছ বিশেষ ব্যবস্থায় পানিতে বাঁচিয়ে রাখা হয়, যেন সংক্রান্তির দিনে তাজা মাছ ক্রেতাদের সামনে তোলা যায়। সব মিলিয়ে শেরপুরের মাছের মেলা শুধু একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়; এটি মৌলভীবাজারের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে থাকা এক অনন্য ঐতিহ্য। পৌষসংক্রান্তির আনন্দের সঙ্গে একই সুতোয় গাঁথা এই মেলা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে নদীর স্রোতের মতোই অবিরাম।

